👁 465 Views

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশী নাকি মসজিদে কথিত শারীরিক মিলন করেছে এই অভিযোগ তুলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

 

আহমাদ ইশতিয়াকঃ

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশী নাকি মসজিদে কথিত শারীরিক মিলন করেছে এই অভিযোগ তুলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরবের আদালত। যদিও তাদের কোন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের বিন্দুমাত্র সুযোগওদেয়া হয়নি। মূলত এক পাকিস্তানি নাগরিকের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিওর ভিত্তিতে এই বিচারের সুত্রপাত করা হয়েছিলো।
.
এমনকি তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা যে বাংলাদেশের নাগরিক সেই বাংলাদেশী দূতাবাসকে জানানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজনও বোধ করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ।
.
আচ্ছা এই মৃত্যুদণ্ড না হয় বাদই দিলাম কিন্তু প্রতি বছর যে শত শত বাংলাদেশী নারী সৌদি আরবে গিয়ে পাশবিক কায়দায় যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, এবং শেষমেশ খালি হাতে দেশে ফিরে এসেছে তাঁদের বিষয়ে সৌদির আদালতের কেন কোন পদক্ষেপ কি দেখা যায় না? কেন তারা এ বিষয়ে সবসময়ই অন্ধ থাকে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এবং তাদের শরিয়া আদালত আসলে এ বিষয়ে কি বলে?
.
কখনো কি দেখেছেন সৌদি সরকার সেই নাগরিকদের কারাদণ্ড দিয়েছে। আচ্ছা কারাদণ্ড তো দূরের কথা জীবনে কখনও তাদের বিচারের মুখোমুখি করানো হয়েছে?
.
প্রতি বছর সৌদি আরবে নির্যাতিত হয়ে কতো বাংলাদেশী নারীর লাশ বাংলাদেশে আসে ভাবতে পারেন? কতজন নারী নির্যাতিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন জানেন?
.
২০১৮-১৯ সালে সৌদি আরব থেকে ২৩১৫ জন বাংলাদেশী নারী ফেরত এসেছেন, যাঁদের বেশিরভাগই যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের কথা বলেছেন।
.
২০১৯ সালের আগস্টে সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা ১১০ জন নারীর মধ্যে ৩৫ শতাংশ শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩৮ জন একই সঙ্গে দুই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন এবং ৪৮ জন নিয়মিত বেতনও পাননি।
.
২০১৬ থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৪৭৩ জন নারীর মরদেহ এসেছে। এর মধ্যে ১৭৫টি লাশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। সেসময় অন্তত ৮১ জন নারী সৌদি আরবে যৌন নির্যাতিত হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।
.
এই নির্যাতনগুলো কিন্তু আজ কালকের নয়। দশকের পর দশক ধরে চলেছে। আল জাজিরা ২০১৯ সালে লিখেছিল, আগের চার বছরে অর্থাৎ ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যা সৌদি আরবে অন্তত ৬৬ জন বাংলাদেশি নারীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫২টি ছিল আত্মহত্যা।
.
এদের সবাই নির্যাতিত হয়েই আত্মহত্যাকে বেছে নিয়েছিলেন। অথচ সৌদি আরবের শরিয়া আদালত এ বিষয়ে পুরোপুরি অন্ধ এবং নিশ্চুপ। কখনও টুঁ শব্দটুকুও করেনি।
.
২০১৯ সালে বিবিসি সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা এক বাংলাদেশী নারীর সঙ্গে কথা বলেছিলো। সেই নারী বলেছিলেন, সৌদি আরবের রিয়াদে তিনি প্রায় দেড় বছর ছিলেন, যার মধ্যে ৫ মাসই তাকে কাটাতে হয়েছিলো পুলিশের হেফাজতে।
.
সেই নারীর নাম আমেনা বেগম। আমেনা বলেছিলেন, ‘যে বাসায় কাজ করতে গিয়েছিলাম, সেখানে যৌন প্রস্তাবে সম্মত না হওয়ায় শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম আমি।
.
যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় টানা তিনদিন আমাকে খেতে দেয়া হয়নি। একপর্যায়ে মেরে হাত ভেঙে দেয়া হয় এবং বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়। ‘তারপর বাসার সামনে গভীর রাতে পুলিশ আমাকে পায় এবং থানায় নিয়ে যায়।’ পরবর্তীতে চিকিৎসা দেয়ার পর সেখানকার এজেন্টের মাধ্যমে তাকে আবারো ওই বাড়িতেই ফিরে যেতে বাধ্য করা হয় ।’

আমেনা বলেছিলেন, সেখানে ফিরে যাওয়ার পর আবারো বেশ কিছুদিন তার উপর শারীরিক অত্যাচার এবং যৌন নির্যাতন চলেছিল।
.
আমেনা বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমাকে শারীরিক নির্যাতন করা তো হতোই, নিয়মিত খাবারও দেয়া হতো না। আর আমি যে একবছর কাজ করেছি তার মধ্যে আমাকে কেবল দু’মাসের বেতন দেয়া হয়েছে; তাও আংশিক।’

শারীরিক অত্যাচারের পর একপর্যায়ে তাকে আবারো একদিন রাতে বাসা থেকে বের করে দেয়া হলে পুলিশ তাকে বাসার সামনে খুঁজে পায় এবং পরবর্তীতে পুলিশের হেফাজতে নেয়া হয় তাকে।’
.
পরে পুলিশের হেফাজত থেকেই দেশে ফেরার ব্যবস্থা হয় তার। অথচ সৌদির আদালতে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র কোন অভিযোগই উঠেনি।
.
খুলনার সালমা বেগম নামের এক নারীর সঙ্গেও কথা বলেছিল বিবিসি। সৌদি আরবে নির্যতনের কারণে তার ছোট বোনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কোন বিচারই তারা চাইতেই পারেননি। লাশও পেয়েছেন ঘটনার অনেক পরে।
.
সালমা বলেছিলেন, ‘নির্যাতনে কারণে আমার ছোট বোন সৌদিতে একটা পরিবারের কাছ থেকে পালিয়ে থানায় গিয়েছিল। কিন্তু পরিবারটি থানা থেকে ফেরত নিয়ে আবার নির্যাতন চালিয়েছিল।তখন তার মৃত্যু হয় বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমার বোনের মৃত্যু হয়েছে মার্চের ৪ তারিখে। কিন্তু আমরা মৃতদেহ পেয়েছি জুলাই মাসের ২০ তারিখে। যদিও হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে বলে আমাদের সার্টিফিকেট দিয়েছে, কিন্তু মাথার পিছনটা ছিল ভাঙা এবং বিভৎস। নির্যাতনের চিহ্ন ছিল শরীরেও।’
.
আচ্ছা এদের বেলায় সৌদির কথিত শরিয়া আইন কোথায় ছিল?
.
এটি যে কেবল বাংলাদেশীদের জন্য তাও নয়। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো,

‘সৌদি আরবে গত ৫ বছরে কেনিয়ার অন্তত ২৭৪ জন শ্রমিক মারা গেছেন। এদের মধ্যা বেশির ভাগই নারী। এর মধ্যে ২০২৪ সালে মারা গেছেন ৫৫ জন। এ সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনগুলো অস্পষ্ট আর পরস্পরবিরোধী। বলা হয়েছিল, কেউ হয়তো ট্রমায় মারা গেছেন। কেউ–বা পুড়ে কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন।
.
অর্থাৎ তাঁদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। একজন নারীর মৃত্যুর কারণ লেখা হয়েছে, ‘ব্রেইন ডেড’। শুধু কেনিয়া নয়, আফ্রিকার আরেক দেশ উগান্ডার অনেক নারী শ্রমিক সৌদি আরবে মারা গেছেন। যদিও উগান্ডার সরকার সেই সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
.
নিউইয়র্ক টাইমসের সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো কেনিয়ার নির্যাতিত এক নারীর কথা।

কেনিয়া থেকে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন ইউনাইস আচিয়েং নামের সেই নারী। ২০২২ সালে সেখান থেকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বাড়িতে ফোন দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, তাঁর সৌদি নাগরিক নিয়োগকারী তাঁকে খুন করার হুমকি দিয়েছে। তাঁকে পানির ট্যাংকে ছুড়ে ফেলেছেন। ইউনাইস আচিয়েং বলেছিলেন, ‘দয়া করে আমাকে বাঁচান!’
.
কিন্তু তাঁর শেষ রক্ষা হয়নি। ইউনাইস আচিয়েংর মা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত বাড়ির ছাদের পানির ট্যাংক থেকে তাঁর মেয়ের গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, মরদেহ এতটাই পঁচে গেছে যে তাঁর মৃত্যুর কারণ বোঝা দুষ্কর। অথচ পরে সৌদি পুলিশ ইউনাইস আচিয়েংর মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে উল্লেখ করে।
.
নির্যাতনকারী নিয়োগকর্তার হাত থেকে বাঁচতে অপর একজন অল্পবয়সী উগান্ডার নারী তিনতলা ভবন থেকে ঝাঁপ দেন। কয়েক বছর আগে তাঁর সন্তান হয়েছিল। আঘাতে তাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। অন্য এক নারী অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর নিয়োগকর্তা তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন। পরে গর্ভধারণ করলে তাঁকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই ঘটনায় পুরোপুরি পথে বসে গিয়েছিলেন সেই নারী। কারণ নিজেদের বাড়ি বিক্রি করেই উপার্জনের জন্য সৌদি গিয়েছিলেন সেই অল্পবয়সী মা।
.
উগান্ডার ইসিকো মোসেস ওয়াইশোয়া নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছিল নিউইয়র্ক টাইমস। তাঁর স্ত্রী আয়েশা মেমে সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে মারা যান। ইসিকো বলেছিলেন, যখন তাঁর স্ত্রীর সৌদির নিয়োগকারী তাঁকে দুটি বিকল্প দিয়েছিল। হয় স্ত্রীর মরদেহ তারা ফেরত পেতে পারেন অথবা স্ত্রীর বকেয়া মজুরির ২ হাজার ৮০০ ডলার পাবেন। যেকোনো একটি বেছে নিতে বলা হয় তাঁকে।
.
ইসিকো বললেন, ‘আমি তাঁকে জবাব দিই, আপনি আমাকে মজুরির বকেয়া অর্থ পাঠান আর নাই পাঠান, আমি আমার স্ত্রীর মরদেহ ফেরত চাই।’
.
সৌদি আরবে আয়েশা মেমের মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আয়েশা শারীরিকভাবে বেশ চিকন ছিলেন। তাঁর শরীরে ব্যাপক আঘাতের চিহ্ন ছিল। পাঁজরের তিনটি হাড় ভেঙে গিয়েছিল। তাঁর কান, হাত আর পায়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের গুরুতর পোড়া দাগ দেখা গেছে। এরপরও সৌদি আদালত ঘোষণা দিয়েছিলো আয়েশার ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হয়েছে।
.
সৌদি আরবে নাকি ব্লাড মানি নামক আইন আছে। এই গরীবের বেলায় সেসব আইন কোথায় ছিল? বাংলাদেশী কিছু মূর্খের পাল যখন সৌদির শরিয়া আইন নিয়ে উৎফুল্ল, শরিয়া আইন শুনলেই তাদের চোখে সৌদিকে অপরাধ শূন্য মনে হয়!
.
সৌদি আরবে কোন ধর্ষণ হয়না, হত্যা হয়না, নির্যাতন হয়না বলে যারা দাবী করে তাদের কাছে আমার প্রশ্ন এতো শত শত লাশের বেলায় তাদের শরিয়া আইন কোথায় থাকে? এতো নারী যে ধর্ষিত হলো সে বিষয়ে শরিয়া আইন কি বলে? এতো যৌন নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যার বিষয়ে শরিয়া আদালতের পদক্ষেপ কি? নাকি তারা গরীব বলে তাদের বেলায় শরিয়া আইন খাটেনা? ‘তাহলে সৌদির কথিত শরিয়া আইন কার জন্য?’ উত্তরটা জানতে চাই।
.

ছবিটি এক বাংলাদেশী বাবার। সৌদিতে যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে হত্যার শিকার হওয়ার মেয়ের লাশ নিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন এই বাবা।