
নওগাঁ প্রতিনিধি: ব্রিটিশ শাসন, ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগ, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান সময়, ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে, জীবন-সন্ধিক্ষণের দুঃসহ বহু বাঁক পেরিয়ে আজো বেঁচে আছেন প্রায় ১৩০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় দেখেছেন অনেক ইতিহাস, সয়েছেন স্বামীর বিচ্ছেদ ও মানসিক যন্ত্রণা। দেশভাগের সময় হারিয়ে যাওয়া স্বামীর সাথে আর কখনোই দেখা হয়নি দীর্ঘ ৭০ বছরেও। হয়ত দাঙ্গায় নিহত হয়েছেন বা এখন আর বেঁচে নেই।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) নিজের বাড়িভিটার জমি দখলের পাঁয়তজরা নিয়ে অভিযোগ জানাতে ৭০ বছর বয়সী মেয়েকে সাথে নিয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আসেন ওই বৃদ্ধা।
কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সহায়তায় তিনি কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় পুলিশ সুপারের কক্ষে পৌঁছান। সেখানে পুলিশ সুপার তাঁকে পরম স্নেহে পাশে বসিয়ে তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। এ সময় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও (ওসি) ডেকে নেওয়া হয়।
পুলিশ সুপারের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের দেশভাগের সময় কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা দেখেছিলেন ওই বৃদ্ধা। দাঙ্গার পর নতুন দেশে আশ্রয়ের সন্ধানে তিন মেয়েকে নিয়ে ট্রেনে করে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় চলে আসেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর স্বামী ট্রেনে উঠতে পারেননি। এরপর কেটে গেছে প্রায় সাত দশক, স্বামীর সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হয়নি তাঁর।
সঙ্গে আসা মেয়েটির বয়স তখন ছিল মাত্র সাত-আট বছর। বাবাকে হারানোর পর তিনিও আর বাবার মুখ দেখতে পারেননি। মা-মেয়ে এক-দুবার কলকাতায় গেলেও খুঁজে পাননি হারিয়ে যাওয়া স্বামী ও বাবাকে। বৃদ্ধার সঙ্গে বাংলাদেশে আসা তিন মেয়ের মধ্যে দুজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। বর্তমানে একমাত্র জীবিত মেয়েকে নিয়েই বসবাস করছেন তিনি।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জেলা প্রশাসনের দেওয়া খাসজমিতে মোটামুটি শান্তিতে বসবাস করে আসছিলেন মা-মেয়ে। কিন্তু সম্প্রতি ওই জমি নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিকারের আশায় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান তাঁরা।
পুলিশ সুপার তাঁদের অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং আশ্বস্ত করে বলেন, জেলা পুলিশ তাঁদের পাশে রয়েছে। আশ্বাস পেয়ে পুলিশ সুপারকে দোয়া করে কার্যালয় ত্যাগ করেন বৃদ্ধা।
একজন মানুষের জীবনে ইতিহাসের এতগুলো অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি দেশভাগের সময় স্বামীকে হারিয়ে দীর্ঘ সাত দশক ধরে তাঁর কোনো খোঁজ না পাওয়া এক বেদনাবিধুর ঘটনা।
বৃদ্ধার এই জীবনকাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রবীণ নাগরিকেরা শুধু পরিবারের সদস্য নন, তাঁরা ইতিহাসেরও জীবন্ত সাক্ষী। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেন তাঁদের অবহেলা, অনিশ্চয়তা কিংবা অন্যায়ের মুখোমুখি হতে না হয়, এ জন্য সবারই দায়িত্বশীল ও মানবিক হওয়া প্রয়োজন।