👁 515 Views

প্রেসক্রিপশনের আড়ালে মুনাফা: রোগী কি চিকিৎসাবাজারের কাঁচামাল?

অসুস্থ মানুষ চিকিৎসকের কাছে যান সুস্থ হওয়ার আশায়। তাঁর হাতে থাকে একটি প্রেসক্রিপশন, সামনে থাকে দীর্ঘ চিকিৎসার অনিশ্চয়তা, আর মনে থাকে চিকিৎসকের প্রতি গভীর আস্থা। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তিই এই আস্থা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আস্থার জায়গাটি কতটা নিরাপদ? রোগীর চিকিৎসাগত প্রয়োজনই কি সব সময় প্রেসক্রিপশনের একমাত্র বিবেচনা, নাকি কোথাও কোথাও তার সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থও যুক্ত হয়ে পড়ে? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থাই প্রকৃত অর্থে সুস্থ ও জনবান্ধব হতে পারে না।

শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বাংলাদেশের সব চিকিৎসক বাণিজ্যিক প্রভাবে প্রেসক্রিপশন দেন—এমন অভিযোগ যেমন সত্য নয়, তেমনি সব ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা ফার্মেসি রোগীর স্বার্থ উপেক্ষা করে—এমন সাধারণীকরণও দায়িত্বশীল নয়। দেশের অসংখ্য চিকিৎসক নিষ্ঠা ও মানবিকতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের ওষুধশিল্পও উৎপাদন ও রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবু সম্ভাব্য অনিয়ম, স্বার্থসংঘাত বা রোগীর তথ্যের ঘাটতিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় রোগীই সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ। তিনি অসুস্থ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল তথ্য তাঁর অজানা এবং চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের ওপর তাঁর নির্ভরতা অনেক বেশি। সেখানেই প্রশ্নটি ফিরে আসে—
রোগীর অসুস্থতা কি কখনো কারও মুনাফার কাঁচামালে পরিণত হচ্ছে?

একই জেনেরিক, বহু ব্র্যান্ড—রোগী জানবেন কীভাবে?
একই কার্যকর উপাদান বা জেনেরিক নামের ওষুধ একাধিক প্রস্তুতকারক বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত করতে পারে। এটি ওষুধশিল্পের স্বাভাবিক বাস্তবতা। একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা উৎপাদন, সরবরাহ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তখন সাধারণ রোগীর সামনে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—কোন ব্র্যান্ডটি কেন দেওয়া হলো? একই জেনেরিকের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে মূল্যের পার্থক্য থাকতে পারে। উৎপাদনব্যয়, মাননিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও উন্নয়ন, বিপণন, সরবরাহব্যবস্থা এবং অন্যান্য ব্যয়ের কারণে এই পার্থক্য তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো ওষুধের গুণমান বিচার করতে শুধু দাম বা ব্র্যান্ডের পরিচিতি যথেষ্ট নয়; উৎপাদনপ্রক্রিয়া, মাননিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব তথ্য সাধারণ রোগীর কাছে কতটা সহজলভ্য? তিনি সাধারণত জানেন না একই জেনেরিকের কতগুলো ব্র্যান্ড বাজারে রয়েছে, তাদের মূল্য কত, কোনগুলো অনুমোদিত এবং তাঁর চিকিৎসার ক্ষেত্রে কী কী নির্ভরযোগ্য বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে। চিকিৎসক একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড লিখে দিলে অধিকাংশ রোগীর কাছে সেটিই প্রয়োজনীয় ওষুধ বলে মনে হয়। অসুস্থ অবস্থায় তিনি বাজার যাচাই করার মতো সময়, তথ্য বা সামর্থ্যও অনেক সময় পান না। এখানেই তৈরি হয় তথ্যের অসমতা—একদিকে চিকিৎসক ও প্রস্তুতকারকের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, অন্যদিকে সেই তথ্যের সীমাবদ্ধতায় থাকা রোগী। অথচ অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত রোগীরই। এই অসমতা দূর করা তাই শুধু ভোক্তা-অধিকারের বিষয় নয়; এটি রোগীর নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন।

প্রেসক্রিপশন চিকিৎসার নির্দেশ, ওষুধ বিক্রির নির্দেশ নয়
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের মূল উদ্দেশ্য রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণ করা। কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বেছে নেওয়ার চিকিৎসাগত কারণ থাকতেই পারে। রোগীর বয়স, রোগের ধরন, পূর্ববর্তী চিকিৎসা, অন্য ওষুধের সঙ্গে সম্ভাব্য পারস্পরিক প্রভাব, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি, মাত্রা কিংবা বিশেষ শারীরিক অবস্থার মতো বিষয় চিকিৎসকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই একই জেনেরিক নাম রয়েছে বলেই সব ব্র্যান্ডকে সব দিক থেকে অভিন্ন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবার শুধু ব্র্যান্ড আলাদা বলেই চিকিৎসাগত পার্থক্য রয়েছে—এমন ধারণাও সঠিক নয়। প্রয়োজন এখানেই স্বচ্ছতার। কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বেছে নেওয়ার চিকিৎসাগত কারণ থাকলে রোগীকে তা বোঝানো যেতে পারে। তাঁর চিকিৎসার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ও উপযুক্ত বিকল্প থাকলে এবং তা চিকিৎসাগতভাবে গ্রহণযোগ্য হলে, রোগীর আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

চিকিৎসকের সঙ্গে ওষুধ কোম্পানির পেশাগত যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। নতুন ওষুধ, গবেষণার ফলাফল, ব্যবহারবিধি, নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে চিকিৎসকদের তথ্য দেওয়া ওষুধশিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন বৈজ্ঞানিক তথ্যের পরিবর্তে বাণিজ্যিক স্বার্থ চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে থাকে।
উপহার, আর্থিক সুবিধা, ভ্রমণ, সম্মানী বা অন্য কোনো প্রণোদনা যদি নির্দিষ্ট ওষুধ বা ব্র্যান্ড ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে বিষয়টি আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রোগীর অধিকার, চিকিৎসা-নৈতিকতা এবং চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি জনআস্থার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। তবে অভিযোগ মানেই অপরাধ নয়। প্রমাণ ছাড়া কোনো চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠান বা প্রতিনিধিকে অভিযুক্ত করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ নথিভুক্তি, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং কার্যকর নজরদারি।

ওষুধের দাম: দীর্ঘ রোগে দীর্ঘ বোঝা
চিকিৎসার ব্যয়ের কথা উঠলে হাসপাতালের বিল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের ফি নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রোগীর পরিবারের জন্য নিয়মিত ওষুধের ব্যয়ই অনেক সময় সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ বহু দীর্ঘস্থায়ী রোগে বছরের পর বছর ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। মাসে কয়েকশ বা কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় একবারে খুব বড় মনে না হলেও দীর্ঘ সময়ে তা একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যয় খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান সহ অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করে। তাই ওষুধের মূল্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও সহজবোধ্য তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়া জরুরি। তবে শুধু কম দামই ওষুধ নির্বাচনের মানদণ্ড নয়। চিকিৎসাগত প্রয়োজন, নিরাপত্তা, গুণমান এবং চিকিৎসকের পরামর্শই প্রধান। কিন্তু রোগী যেন এসব বিষয় সম্পর্কে জানার সুযোগ পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
রোগীকে তথ্যসমৃদ্ধ অংশীদার করা মানে চিকিৎসকের কর্তৃত্ব কমানো নয়; বরং চিকিৎসার প্রতি তাঁর আস্থা আরও শক্ত করা।

ফার্মেসি: চিকিৎসার শেষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
চিকিৎসকের পরামর্শের পর ওষুধ রোগীর হাতে পৌঁছায় ফার্মেসির মাধ্যমে। ফলে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই শেষ ধাপটির গুরুত্বও কম নয়। সঠিক ওষুধ, সঠিক মাত্রা, মেয়াদ, সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবহারবিধি—সবকিছুর সঙ্গে রোগীর নিরাপত্তা জড়িত। প্রেসক্রিপশনে নির্ধারিত ব্র্যান্ডের পরিবর্তে অন্য ব্র্যান্ড দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। শুধু জেনেরিক নাম এক হলেই সব পরিস্থিতিতে একটি ওষুধের পরিবর্তে অন্যটি দেওয়া নিরাপদ—এমন ধারণা সঠিক নয়। চিকিৎসকের নির্দেশনা এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করেই এ ধরনের পরিবর্তন করা উচিত। একই সঙ্গে রোগীর অজ্ঞতা বা অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি দামের ব্র্যান্ড বিক্রি করা গ্রহণযোগ্য নয়। ফার্মেসি ব্যবসা করবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ওষুধের ব্যবসায় মুনাফার পাশাপাশি রোগীর নিরাপত্তার দায়িত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জাপানের অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
জাপানে প্রায় চার দশক বসবাসের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করেছি—চিকিৎসা, প্রেসক্রিপশন, স্বাস্থ্যবিমা, ফার্মেসি এবং ওষুধ সরবরাহের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে।
এটি জাপানের স্বাস্থ্যব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন নয়। সেখানেও চিকিৎসার ব্যয়, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ, চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা এবং চিকিৎসকদের ওপর কর্মভারসহ নানা সমস্যা রয়েছে। তবে জাপানের কিছু কাঠামোগত ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। জাপানে স্বাস্থ্যবিমার আওতাভুক্ত ওষুধের মূল্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে নির্ধারিত হয় এবং সময় সময় তা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রেও নথিভুক্ত প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। জেনেরিক ওষুধ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার সরকারি ব্যবস্থাও রয়েছে। ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ চিকিৎসা ও ওষুধসংক্রান্ত তথ্যকে আরও নথিভিত্তিক করার পথে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য জাপানের পুরো ব্যবস্থা হুবহু অনুসরণ করাও সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। দুই দেশের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও চিকিৎসাবাজারের কাঠামো ভিন্ন।

কিন্তু শিক্ষাটি স্পষ্ট—
শুধু ভালো মানুষ দিয়ে ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি হয় না; প্রয়োজন ভালো প্রতিষ্ঠান, সুস্পষ্ট নিয়ম, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং কার্যকর জবাবদিহি।
বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে রোগী সহজে জানতে পারবেন তিনি কী ওষুধ গ্রহণ করছেন, তার মূল্য কত, প্রস্তুতকারক কে এবং প্রয়োজন হলে কোথা থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে।

চিকিৎসকের কাছে সমাজের প্রত্যাশা
চিকিৎসকের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত দায়িত্ব। রোগী চিকিৎসকের জ্ঞানের ওপর নির্ভর করেন। তাই সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা চিকিৎসকের পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নেওয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধের কারণ বোঝানো, কত দিন গ্রহণ করতে হবে তা জানানো এবং গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সতর্ক করা দায়িত্বশীল চিকিৎসারই অংশ। কয়েক মিনিটের একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যাও অনেক সময় রোগীর ভুল বোঝাবুঝি, অযথা ভয় এবং ভুলভাবে ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি কমাতে পারে। চিকিৎসকের মর্যাদা শুধু জ্ঞান ও দক্ষতায় নয়; রোগীর প্রতি সততা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক আচরণেও প্রকাশ পায়।

ওষুধশিল্পের সাফল্যের সঙ্গে নৈতিকতার দায়ও আছে
বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি নৈতিকতার মানও উচ্চ রাখতে হবে। বৈজ্ঞানিক তথ্য উপস্থাপন, বিপণন, চিকিৎসকদের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক এবং বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা—সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা প্রয়োজন। কারণ ওষুধ কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়। ভুল তথ্য বা অনুপযুক্ত ব্যবহারের পরিণতি এখানে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়; কখনো তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ওষুধের ক্ষেত্রে মানুষের আস্থা হারালে কোনো প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। তাই ওষুধশিল্পের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো মানুষের বিশ্বাস অটুট রাখা।

সরকারের দায়িত্ব: বাজারকে বিশ্বাসযোগ্য করা
স্বাস্থ্য ও ওষুধের বাজারকে শুধু প্রতিযোগিতার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এখানে রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ওষুধের নিবন্ধন, মাননিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ এবং মূল্যসংক্রান্ত তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে জেনেরিক নামের মাধ্যমে প্রস্তুতকারক, নিবন্ধন, মূল্য এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য জানা যাবে। চিকিৎসক ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে; আবার প্রমাণ ছাড়া কাউকে হয়রানি বা অভিযুক্ত করার সুযোগও রাখা যাবে না। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য শুধু শাস্তি দেওয়া নয়; এমন একটি বাজার তৈরি করা, যেখানে আইন মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করতে পারে, চিকিৎসক পেশাগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারেন এবং রোগীর স্বার্থ সবার আগে সুরক্ষিত থাকে।

রোগীরও প্রশ্ন করার অধিকার আছে
চিকিৎসককে প্রশ্ন করাকে অসম্মান মনে করার মানসিকতা বদলাতে হবে।
একজন রোগী জানতে চাইতে পারেন—
⦁ এই ওষুধটির দাম কত?
⦁ এই ওষুধটি কেন প্রয়োজন?
⦁ কত দিন এই ওষুধটি খেতে হবে?
⦁ এই ওষুধটির জেনেরিক নাম কী?
⦁ চিকিৎসার দিক থেকে এই ওষুধের কোনো উপযুক্ত বিকল্প আছে কি?
⦁ এই ওষুধের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কি সতর্ক থাকতে হবে?

এসব প্রশ্ন অবিশ্বাসের প্রকাশ নয়; নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার স্বাভাবিক অধিকার। তবে সচেতনতার অর্থ নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করা, মাত্রা পরিবর্তন করা বা অন্য ওষুধ শুরু করা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিচিতজনের অভিজ্ঞতা কিংবা অনলাইন বিজ্ঞাপন চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারে না।
সচেতন রোগী চিকিৎসককে অস্বীকার করেন না; তিনি নিজের চিকিৎসা বুঝে নিতে চিকিৎসকের সঙ্গে দায়িত্বশীল অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায়
আজকের বাংলাদেশই আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ। আমরা যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করছি, তার সুফল ও দুর্বলতা একদিন তাদেরই বহন করতে হবে। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে চিকিৎসক চিকিৎসাগত বিবেচনায় স্বাধীন থাকবেন, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ন্যায়সংগত ও নৈতিকভাবে ব্যবসা করবে, ফার্মেসি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ওষুধ সরবরাহ করবে এবং সরকার কার্যকর আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। আর রোগী জানবেন, প্রশ্ন করবেন এবং নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানার অধিকার রাখবেন। এটি কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং চিকিৎসক, ওষুধশিল্প, ফার্মেসি, রাষ্ট্র ও রোগী—প্রত্যেকের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট করার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পারস্পরিক আস্থা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করার আহ্বান।

শেষ কথা
স্বাস্থ্যসেবা কোনো সাধারণ বাজার নয়।
এখানে একজন মানুষ যখন চিকিৎসার জন্য আসেন, তখন তিনি সাধারণ ক্রেতার মতো স্বাধীন অবস্থানে থাকেন না। তিনি অসুস্থ, তাঁর তথ্য সীমিত এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাঁকে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই স্বাস্থ্যসেবায় নৈতিকতার মান অন্য যেকোনো বাজারের চেয়ে উচ্চতর হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমস্যার সমাধান কোনো একটি পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করে সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে চিকিৎসকের জ্ঞান ও পেশাগত স্বাধীনতা, ওষুধশিল্পের উৎপাদন ও ব্যবসা, ফার্মেসির কার্যক্রম এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু রোগীর নিরাপত্তা, অধিকার ও কল্যাণকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। প্রেসক্রিপশন হবে রোগীর চিকিৎসার পথনির্দেশ, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়লক্ষ্য পূরণের উপায় নয়। ওষুধ হবে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার উপকরণ; মানুষের অসুস্থতা কখনোই মুনাফার কাঁচামালে পরিণত হওয়া উচিত নয়। আর চিকিৎসকের সামনে বসা মানুষটি শুধু একজন “ক্রেতা” নন—তিনি একজন রোগী, একজন নাগরিক, সর্বোপরি একজন মানুষ। তাঁর জীবন, স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের প্রতি সম্মান দেখানো স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি অংশীজনের দায়িত্ব।

কারণ একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কত বড়—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেখানে একজন অসুস্থ সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ।

লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষকঃ হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান
coinbangla@gmail.com
৩০শে আগষ্ট ২০২৬ইং, রবিবার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *