👁 452 Views

হাইকোটের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে শার্শায় দাপট দেখাচ্ছে অবৈধ ইটভাটা, বিপর্যস্ত পরিবেশ ও জনজীবন

আব্দুল মান্নান, শার্শা (যশোর) থেকে ॥ পরিবেশ ধ্বংস, কৃষিজমি দখল, কৃষি জমির টপ সয়েল ধ্বংস, আবাদি জমি নিধন, বৃক্ষনিধন ও ভয়াবহ বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে অবৈধ ইটভাটা। হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যশোরের শার্শা উপজেলায় একাধিক ইটভাটা অবৈধভাবে চালু রয়েছে, যা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। হাইকোর্টের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইটভাটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা ও জনবসতি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব (সাধারণত তিন কিলোমিটারের মধ্যে) স্থাপন করা যাবে না। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন, কাঠ বা জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করে ইট পোড়ানো, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ভাটা পরিচালনাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, এসব শর্ত লঙ্ঘনকারী ভাটা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে গত ১২ মার্চ ২০২৪ সালে হাইকোর্টে দায়ের হওয়া একটি রিটের আলোকে গঠিত একটি পরিদর্শন কমিটি শার্শা উপজেলার ২৩টি ইটভাটা সরেজমিনে পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য ২৩টির মধ্যে ২০টি ইটভাটাই কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইট পোড়ানো ও কাঁচা ইট তৈরিসহ সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন এবং সংশ্লিষ্ট ভাটা মালিকদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করেন। তবে প্রশাসনিক নির্দেশনার পর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লক্ষণপুর ইউনিয়নের মেসার্স কে এ এ ব্রিকস, বাগআঁচড়া ইউনিয়নের টেংরা জামতলার সিরাজুলের মেসার্স রিফা ব্রিক্স, একই ইউনিয়নের জামতলার তৌহিদুর রহমানের মেসার্স বিশ্বাস ব্রিক্স, কুচেমোড়া হাড়িখালির মিজানুর রহমানের টাটা ব্রিক্স, গোগা ইউনিয়নের হযরত আলির মেসার্স রাজ ব্রিকস, ইছাপুর এলাকার শফিউর রহমানের মেসার্স এস টি ব্রিকস, কায়বা ইউনিয়নের পশ্চিমকোটার হাজরাতলা এলাকার আরফাত ইসলামের মেসার্স নাইস ব্রিকস, বাগআঁচড়া ইউনিয়নের টেংরা জামতলার সিরাজুলের মেসার্স রিফা ব্রিক্স, একই ইউনিয়নের জামতলার তৌহিদুর রহমানের মেসার্স বিশ্বাস ব্রিক্স, পিঁপড়াগাছীর শহিদুল ইসলামের মেসার্স সাফা ব্রিক্সসহ প্রায় ২০টি ইটভাটা এখনও অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল কবিরের মালিকানাধীন মেসার্স প্রাইম ব্রিক্স। এছাড়া আর্থিক সংকট ও লাইসেন্স জটিলতার কারণে আরও তিনটি ভাটা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। ভাটা মালিকদের দাবি, সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই একসময় ‘হাওয়া ভাটা’ ও ‘ঝিকঝাক ভাটা’র লাইসেন্স গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতার কারণে বর্তমানে নতুন করে লাইসেন্স প্রদান ও বিদ্যমান লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার ইটভাটা চালু রয়েছে, যার মধ্যে আনুমানিক ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ভাটা অবৈধ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব ভাটায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন। লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেওয়া হলে তারা সরকারি আইন, পরিবেশগত শর্ত ও শ্রম আইন মেনেই ভাটা পরিচালনা করবেন বলে দাবি করেন তারা। তবে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অবৈধ ইটভাটা বন্ধে প্রশাসনের দুর্বলতা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দ্রুত উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন, নিয়মিত মনিটরিং এবং অবৈধ ভাটা স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন তারা। শার্শা উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল কবির বলেন, একসময় সরকারি নিয়ম মেনেই আমরা ভাটার লাইসেন্স নিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় অনেক ভাটা সংকটে পড়েছে। লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দেওয়া হলে আমরা পরিবেশ আইন ও শ্রম আইন মেনেই ভাটা পরিচালনা করতে প্রস্তুত। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে আমরা ভাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে আইন অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও বৈধ লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি। যেসব ভাটা আদালতের নির্দেশ অমান্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *