👁 389 Views

ফারাক্কা বাঁধ ও বাংলাদেশ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক সংকটের নাম। ১৯৭৫ সালে চালুর পর থেকে আন্তঃসীমান্ত গঙ্গার পানি একতরফা প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে । ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ওপর যে প্রভাবগুলো পড়ছে তা নিচে আলোচনা করা হলো:

শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব:
গ্রীষ্ম ও শুষ্ক মৌসুমে ভারত গঙ্গার পানি উজানে সরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশের পদ্মা নদী ও এর শাখা-প্রশাখাগুলোতে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। এর ফলে নদীগুলো শুকিয়ে মরে যায় এবং নদীর বুকে বিশাল চর জাগে।

মরুকরণ ও কৃষি সংকট:
পর্যাপ্ত পানির অভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গবেষকদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের প্রায় ৬ কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বর্ষায় অকাল বন্যা: বর্ষাকালে ফারাক্কা বাঁধের সব গেট খুলে দেওয়ার কারণে পদ্মায় আকস্মিক তীব্র প্রবাহ দেখা দেয়, যা বাংলাদেশের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন সৃষ্টি করে।

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস:
পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন ও স্বভাবিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পানির ন্যায্য হিস্যা ও চুক্তি:
এই সংকট নিরসনে ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদী ‘গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে মে) ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহের ভিত্তিতে দুই দেশ নির্দিষ্ট অনুপাতে পানি পেয়ে থাকে।

ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব ও স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে রাজবাড়ীর পাংশায় প্রায় ৫০ বিলিয়ন টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণের মতো বড় পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।

এই বাঁধ ও পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে বিস্তারিত তথ্যে:

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি এবং ফারাক্কা বাঁধের পানির ন্যায্য হিস্যা সংক্রান্ত বিস্তারিত ও হালনাগাদ তথ্য নিচে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে আলোচনা করা হলো:

১. ১৯৯৬ সালের চুক্তির মূল ফর্মুলা১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে) ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রাপ্যতা অনুযায়ী তিন ধরনের ভাগাভাগির নিয়ম নির্ধারণ করা হয়।

৭০,০০০ কিউসেক বা তার কম প্রবাহ থাকলে: ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েই সমান ৫০% করে পানি পাবে।

৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কিউসেক প্রবাহ থাকলে: বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে ৩৫,০০০ কিউসেক পানি পাবে এবং বাকি পানি ভারত পাবে।

৭৫,০০০ কিউসেক বা তার বেশি প্রবাহ থাকলে: ভারত পাবে ৪০,০০০ কিউসেক এবং বাকি অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশ পাবে।

বিশেষ চক্র (১১ মার্চ – ১০ মে):
এই সবচেয়ে সংকটাপন্ন সময়ে দুই দেশই পর্যায়ক্রমে (১০ দিনের চক্রে) আবশ্যিকভাবে ন্যূনতম ৩৫,০০০ কিউসেক পানি পাওয়ার গ্যারান্টি পায়।

২. বর্তমান সংকট ও বাংলাদেশের দাবিচুক্তির মূল সমস্যা হলো, এতে “ন্যূনতম পানির নিশ্চয়তা (Minimum Guarantee Clause)” সংক্রান্ত কোনো ধারা নেই।
যদি জলবায়ু পরিবর্তন বা উজানে অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের কারণে ফারাক্কা পয়েন্টে প্রবাহ ৫০,০০০ কিউসেকের নিচে নেমে যায়, তবে চুক্তির ধারা অনুযায়ী কেবল জরুরি আলোচনার কথা বলা হয়েছে।

ঐতিহাসিক উপাত্তের সমস্যা:
১৯৯৬ সালের চুক্তিটি ১৯৪৯-১৯৮৮ সালের (৪০ বছরের পুরনো) পানি প্রবাহের ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বর্তমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও চাহিদার কারণে এই পুরনো উপাত্ত এখন আর কার্যকর নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান:
বাংলাদেশ চাইছে গঙ্গার উজান থেকে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার বন্ধ করে পুরো নদীর সামগ্রিক প্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে পানির ন্যায্য হিস্যা নির্ধারণ করা হোক। পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে গড়ে অন্তত ৪০,০০০ কিউসেক নিশ্চিত পানি অবমুক্ত করার দাবি জানানো হচ্ছে।

৩. ২০২৬ সালের চুক্তি নবায়ন ও কূটনৈতিক গুরুত্বআগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এ গঙ্গা পানি চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।
ফলে এই চুক্তিটির নবায়ন বা নতুন চুক্তি স্বাক্ষর বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

কারিগরি প্রস্তুতি ও বিশেষজ্ঞ কমিটি:
চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে এবং যৌথ নদী কমিশনের (JRC) মাধ্যমে দুই দেশের কারিগরি দল কাজ শুরু করেছে।

ভারতের নতুন ফর্মুলার প্রস্তাব:
ভারত ফারাক্কা পয়েন্টে চলমান পানি প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন ফর্মুলার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞরা (যেমন: ড. আইনুন নিশাত) “অযৌক্তিক” বলে আখ্যা দিয়েছেন; কারণ উজানে ভারতের অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের কারণেই ফারাক্কায় প্রবাহ কমে যায়।

রাজনৈতিক গুরুত্ব:
বাংলাদেশের বর্তমান নীতি অনুযায়ী, ভারতের সাথে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি এই গঙ্গা পানি চুক্তির ন্যায্য সমাধানের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে।

৪. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৬ মে ফারাক্কা দিবসফারাক্কা বাঁধের একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে মরণঘাতী প্রভাবের প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ‘ফারাক্কা লংমার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে শুরু হওয়া এই লংমার্চ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পানির অধিকারের দাবিকে প্রথম জোরালোভাবে তুলে ধরে। প্রতি বছর ১৬ মে বাংলাদেশে “ফারাক্কা দিবস” হিসেবে পালিত হয়।

আন্তর্জাতিক নদীতে ভারতের আগ্রাসী বাঁধ:

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে অন্তত ৩৬টিতে ভারত একতরফাভাবে বাঁধ বা ব্যারেজ নির্মাণ করেছে, যা আন্তর্জাতিক নদী আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশের জন্য এক বড় ধরনের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। উজানের দেশ হিসেবে ভারত কর্তৃক অভিন্ন নদীগুলোর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার ও নিয়ন্ত্রণ করার এই নীতি বাংলাদেশে “নদী আগ্রাসন” হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ভারতের প্রধান ৩টি আগ্রাসী বাঁধ এবং নদী সংযোগ প্রকল্প নিচে তুলে ধরা হলো:

১. প্রধান আগ্রাসী বাঁধ ও এর প্রভাবফারাক্কা বাঁধ (পদ্মা নদী): পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে নির্মিত এই বাঁধের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলী নদীতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গেছে এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চল মরুকরণের দিকে এগোচ্ছে।

গজলডোবা ব্যারেজ (তিস্তা নদী):
পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে তিস্তা নদীর ওপর এই ব্যারেজ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় সব পানি প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। ফলে বাংলাদেশের তিস্তা অববাহিকা ও লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

ডুম্বুর ও টিপাইমুখ বাঁধ (বরাক/মেঘনা নদী):
ভারতের ত্রিপুরায় গোমতী নদীর ওপর ডুম্বুর বাঁধ এবং মণিপুরে বরাক নদীর ওপর প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ বাংলাদেশের সিলেট ও পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা তথা মেঘনা অববাহিকার জন্য বড় হুমকি। বর্ষাকালে হঠাৎ ডুম্বুর বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের কুমিল্লা ও ফেনী অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ ও আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে।

২. ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প (River Linking Project)

আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ভারত বর্তমানে ‘ইন্টার-বেসিন রিভার লিঙ্কিং প্রজেক্ট’ বা নদী সংযোগ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর উদ্দেশ্য হলো ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার মতো বড় আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উদ্বৃত্ত পানি খরাপ্রবণ দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে সরিয়ে নেওয়া। এই প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমিতে পরিণত হবে এবং বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানিতে ডুবে যাবে।

৩. আন্তর্জাতিক নদী আইনের লঙ্ঘন:
আন্তর্জাতিক আইন (যেমন: ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপ্রবাহ কনভেনশন) অনুযায়ী, কোনো দেশই ভাটির দেশের ক্ষতি করে বা তাদের না জানিয়ে আন্তর্জাতিক নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করতে পারে না। ভারত এই কনভেনশনে স্বাক্ষর না করে তাদের ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আন্তর্জাতিক নদীগুলোকে নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে, যা স্পষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ। ভারতের এই একতরফা পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার কিংবা জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করার দাবি দীর্ঘদিনের।

ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু হলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা:

১৯৫০-এর দশকে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের পরিকল্পনা এবং ১৯৬১ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তীব্র কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পাকিস্তানের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভা ভারতের এই একতরফা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের মূল ভূমিকা ও পদক্ষেপগুলো নিচে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে তুলে ধরা হলো:

১. প্রাথমিক আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও আইনি আপত্তি:

১৯৫১ সালের প্রথম প্রতিবাদ:

ভারত ১৯৫০-৫১ সালের দিকে যখন প্রাথমিক পরিকল্পনা শুরু করে, তখনই পাকিস্তান সরকার ২৯ অক্টোবর ১৯৫১ তারিখে প্রথম ভারতকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠায়। চিঠিতে সতর্ক করা হয় যে, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নিলে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) কৃষি, নৌচলাচল ও পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতি হবে।
আন্তর্জাতিক আইনের অনুষঙ্গ:
পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক নদী আইনের (যেমন ভাটির দেশের অধিকার) ওপর ভিত্তি করে ভারতের এই পদক্ষেপকে বেআইনি ও একতরফা হিসেবে আখ্যা দেয়।

২. ভারতের কৌশল ও পাকিস্তানের ব্যর্থতাভারতের “কালক্ষেপণ” কৌশল:

পাকিস্তানের প্রতিবাদের জবাবে ভারত ১৯৫২ সালে জানায় যে, প্রকল্পটি কেবল প্রাথমিক অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে এবং পাকিস্তানের আশঙ্কাগুলো সম্পূর্ণ “কাল্পনিক” বা অনুমাননির্ভর। এই অজুহাতে ভারত আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে থাকে এবং ভেতরে ভেতরে নিজেদের মূল নকশা ও প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়ে যায়।

যৌথ সমীক্ষার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান:
১৯৫৪ সালে পাকিস্তান পাল্টা কৌশল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) প্রকল্প’-এর রূপরেখা দেয় এবং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় যৌথ জরিপের প্রস্তাব করে। কিন্তু ভারত সরকার সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।

৩. ১৯৬১ সালে নির্মাণ কাজ শুরুর পর কঠোর অবস্থানবিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক: ১৯৬১ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে মূল নির্মাণ কাজ শুরু করলে পাকিস্তান সরকার চাপের মুখে পড়ে। ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে দুই দেশের পানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চারটি বড় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ভারত কোনো ধরনের আপস করতে রাজি না হওয়ায় আলোচনাগুলো সম্পূর্ণ স্থবির (Deadlock) হয়ে যায়।

পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার প্রস্তাব (১৯৬৫):
১৯৬৫ সালের জুলাই মাসে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভায় (East Pakistan Assembly) ভারতের একতরফা ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সর্বসম্মতভাবে একটি নিন্দা ও প্রতিবাদ প্রস্তাব পাস হয়। কেন্দ্রীয় সরকারকে আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানানো হয়।

৪. পাকিস্তান সরকারের সীমাবদ্ধতা ও চূড়ান্ত স্থবিরতাঅভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা:

তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সামরিক সরকার পশ্চিম পাকিস্তান-কেন্দ্রিক থাকায় পূর্ব পাকিস্তানের পরিবেশগত এই সংকটকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যতটা জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল, ততটা রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখায়নি।

১৯৬৫ সালের যুদ্ধ:
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যকার সব ধরনের পানি আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এই সুযোগে ভারত নির্বিঘ্নে ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণ কাজ এগিয়ে নিয়ে যায় এবং ১৯৭০ সালের মধ্যে মূল কাঠামো সম্পন্ন করে।

সংক্ষেপে, তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আলোচনা ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে এর বিরোধিতা করলেও ভারতের দৃঢ় অবস্থান এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও সামরিক অদূরদর্শিতার কারণে এই আগ্রাসী বাঁধ নির্মাণ ঠেকানো সম্ভব হয়নি

১৯৭৫ সালে বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশর আর্থিক ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ:

১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ চালু এবং শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের পর থেকে বাংলাদেশ ভয়াবহ ও অপূরণীয় বহুমুখী আর্থিক এবং পরিবেশগত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। গত অর্ধ শতাব্দীতে এই বাঁধের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি গবেষক, পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং সরকারি বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের আর্থিক ও পরিবেশগত ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ (Financial Damages)নদী গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ৫০ বছরে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বিশাল।

বার্ষিক ক্ষতি:
নদী গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, পানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও শিল্প খাতে বছরে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

সামগ্রিক প্রত্যক্ষ ক্ষতি:
গত ৫০ বছরে ফারাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের সরাসরি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি)

বহুমাত্রিক ও পরোক্ষ ক্ষতি:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ও প্রখ্যাত ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞার গবেষণা এবং নেপালি পানি বিশেষজ্ঞ ড. শাস্ত্র দত্ত পন্থের প্রবন্ধ অনুযায়ী, ২০০৩ সাল পর্যন্ত ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক ও পরোক্ষ ক্ষতির মোট আর্থিক মূল্য হিসাব করলে তা ১১ লাখ বিলিয়ন (বা ১১ হাজার ট্রিলিয়ন) টাকা ছাড়িয়ে যায়।

২. পরিবেশগত ও বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয় (Environmental Degradation)
পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

সুন্দরবন ও লবণাক্ততার আগ্রাসন:
ফারাক্কা বাঁধের আগে খুলনা ও সুন্দরবন অঞ্চলে পানির লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল মাত্র ৫০০ মাইক্রোমোস, যা পানি প্রত্যাহারের পর আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ২৯,৫০০ মাইক্রোমোসে পৌঁছায়। তীব্র লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনের প্রধান ঐতিহ্য ‘সুন্দরী গাছ’ টপ-ডাইং (আগা মরা) রোগে আক্রান্ত হয়ে বিলুপ্তির মুখে পড়ছে এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাসস্থান হুমকির মুখে পড়েছে।

নদী অবক্ষয় ও নৌপথের ক্ষতি:
ফারাক্কা চালু হওয়ার আগে ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে যথাক্রমে ১৩,৫০০ ও ৮,৫০০ কিলোমিটার নৌপথ সচল ছিল। বর্তমানে তা কমে মাত্র ৬,০০০ ও ৩,৮০০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে, অর্থাৎ প্রায় ৬৮০০ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ নৌপথ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। পদ্মার গড়াই, মধুমতি, কপোতাক্ষ, নবগঙ্গাসহ প্রায় ৫০টি শাখা নদী এখন মৃতপ্রায়।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামা:
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে আগে যেখানে মাত্র ৮ থেকে ১০ ফুট গভীরতায় ভূগর্ভস্থ পানির প্রথম স্তর পাওয়া যেত, এখন সেখানে ৬০ থেকে ১০০ ফুট নিচে নেমে গেছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন:
পানি বিশেষজ্ঞরা (যেমন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার) উল্লেখ করেছেন যে, প্রবাহ কমে নদীগুলো শুকিয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হওয়ায় সূর্যের তাপ সরাসরি বালিতে আঘাত করছে। এর ফলে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে।

৩. কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতিকৃষি বিপর্যয়:
পানির অভাবে দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ প্রকল্প ‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) প্রকল্প’-এর প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকায় এখন আর শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না। মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় প্রতি বছর লক্ষ্য লক্ষ্য টন ফসলহানি ঘটছে।

মৎস্য উৎপাদন হ্রাস:
ইলিশসহ বিভিন্ন দেশি প্রজাতির মাছের প্রজনন পথ রুদ্ধ হয়েছে পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ ও গভীরতা কমে যাওয়ায় মৎস্যজীবীদের জীবিকা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বহু মানুষ পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।

দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনে ফারাক্কার প্রভাব:

ফারাক্কা বাঁধ কেবল আঞ্চলিক নদীপ্রবাহকেই পরিবর্তন করেনি, বরং গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার জলবায়ুর ওপর একটি কৃত্রিম অনুঘটক (Catalyst) হিসেবে কাজ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে চরম সংকটে ফেলেছে।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক প্রভাবগুলোর (যেমন হিমালয়ের হিমবাহ গলন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত) সাথে ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট কৃত্রিম পরিবেশগত সংকট যুক্ত হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অববাহিকায় এক মারাত্মক বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করেছে। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনে ফারাক্কার মূল প্রভাবগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. আঞ্চলিক মাইক্রো-ক্লাইমেট (Micro-climate) পরিবর্তন ও মরুকরণতাপমাত্রা বৃদ্ধি:

ফারাক্কার কারণে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিশাল চর জেগে উঠছে। পানিহীন বালুচরে সূর্যের আলো সরাসরি পড়ার ফলে স্থানীয় গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বায়ুর আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে। এটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট স্থানীয় আবহাওয়া বা ‘মাইক্রো-ক্লাইমেট’কে উত্তপ্ত ও শুষ্ক করে তুলছে।

মাটির আর্দ্রতা হ্রাস:
নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এর ফলে মাটির উপরিভাগের আর্দ্রতা বা ‘সয়েল ময়েশ্চার’ হারিয়ে যাচ্ছে, যা অঞ্চলটিকে তীব্র খরার দিকে ঠেলে দিয়ে এক ধরনের মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে।

২. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও তীব্র করা (Compounding Effect) লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ:

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (Sea Level Rise) পাচ্ছে। ফারাক্কার কারণে নদী থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি খুব সহজেই দেশের অভ্যন্তরে এবং সুন্দরবনের গভীর মূলে প্রবেশ করছে। প্রাকৃতিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংকটকে ফারাক্কা বাঁধের কৃত্রিম প্রভাব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

আকস্মিক বন্যা ও চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া:
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের ধরন অনিয়মিত হয়ে গেছে (কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও অনাবৃষ্টি)। ভারত যখন বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সামলাতে ফারাক্কার সব গেট একসাথে খুলে দেয়, তখন ভাটির অঞ্চলে প্রাকৃতিক বন্যার তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়।
৩. কার্বন সিঙ্ক (Carbon Sink)
সুন্দরবনের ক্ষতি ও কার্বন নিঃসরণসুন্দরবন হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘কার্বন সিঙ্ক’ (যা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে)।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদীপ্রবাহ কমে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনের মিঠাপানির উদ্ভিদের (যেমন সুন্দরী গাছ) দ্রুত অবক্ষয় ঘটছে। বনভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে প্রাকৃতিকভাবে কার্বন শোষণের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে এই অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের গতিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৪. বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা ও জলবায়ু শরণার্থী (Climate Refugees)

জলবায়ু পরিবর্তন এবং ফারাক্কার যৌথ প্রভাবে নদীভাঙন, স্থায়ী খরা এবং মাটির লবণাক্ততার কারণে প্রতি বছর অববাহিকা অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ তাদের কৃষিজমি ও জীবিকা হারাচ্ছে।

জীবিকা হারানো এই বিশাল জনগোষ্ঠী ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বড় শহরে (যেমন ঢাকা, কলকাতা) স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। এটি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর তীব্র জলবায়ুজনিত চাপ সৃষ্টি করছে।

সংক্ষেপে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক ক্ষতিগুলোকে মানবসৃষ্ট ফারাক্কা বাঁধের ভুল পানি ব্যবস্থাপনা আরও বেশি তীব্র, অনিয়মিত এবং ধ্বংসাত্মক করে তুলেছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশগত নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি।

ফারাক্জীকার বাঁধের কারণে ববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য:

ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপর যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার পরিমাণ ও ভয়াবহতা সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯৭৫ সালের পর থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় খাদ্য শৃঙ্খলের প্রথম ধাপ থেকে শুরু করে জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ এবং বন্যপ্রাণীর বিশাল একটি অংশ বিলুপ্ত বা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট এবং বিস্তারিত পরিমাণ নিচে আলোচনা করা হলো:

১. মৎস্য সম্পদের ক্ষতি ও মাছের প্রজনন বিলুপ্তিলোকাল এক্সটিংকশন বা স্থানীয় বিলুপ্তি: আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত যৌথ গবেষণা (১৯৮২-২০১৭ সময়ের উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে) অনুযায়ী, নিম্ন গঙ্গা বা পদ্মা নদীতে একসময় পাওয়া যেত এমন ২৮টি দেশীয় প্রজাতির মাছ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত বা স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৬টি প্রজাতি ছিল জাতীয়ভাবে বিপন্ন বা হুমকির মুখে থাকা মাছ। হুমকির মুখে থাকা মাছের হার:
আইইউসিএন (IUCN Bangladesh) এর মানদণ্ড অনুযায়ী, পদ্মা নদীতে বর্তমানে টিকে থাকা মাছের প্রজাতিগুলোর মধ্যে প্রায় ৩৫% চরম হুমকির মুখে রয়েছে (যার মধ্যে ২৪% বিপন্ন বা Endangered, ৮% ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩% গুরুতরভাবে বিপন্ন)।

ইলিশের প্রজনন ব্যাহত:
ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদীর গভীরতা ও পানির বেগ কমে যাওয়ায় সমুদ্র থেকে ইলিশের উজানে আসার পথ রুদ্ধ হয়েছে। ফলে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় বাণিজ্যিকভাবে ইলিশের উৎপাদন এবং তাদের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
১. খাদ্য শৃঙ্খলের বিপর্যয় ও ফাইটোপ্লাঙ্কটন হ্রাসকার্বন ও পলিপ্রবাহ হ্রাস:

দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের তুলনায় পদ্মা নদীতে পলিপ্রবাহ প্রায় ২০% এবং কার্বন প্রবাহ প্রায় ৩০% হ্রাস পেয়েছে।

খাদ্য উৎপাদনে ধস:
নদীতে প্রাকৃতিকভাবে খনিজ পদার্থ এবং পুষ্টি উপাদান কমে যাওয়ায় নদী ও এর অববাহিকার জলাভূমিগুলোতে ফাইটোপ্লাঙ্কটন (Phytoplankton) উৎপাদন প্রায় ৩০% কমে গেছে। ফাইটোপ্লাঙ্কটন জলজ খাদ্য চক্রের প্রথম ধাপ হওয়ায় এটি কমে যাওয়ার সাথে সাথে সরাসরি মাছ ও অন্যান্য জলজ জীবের প্রজনন ও উৎপাদন ৩০% কমে গেছে।

১. ⁠১. জলজ ও বন্যপ্রাণীর মহাবিপর্যয়গাঙ্গেয় ডলফিন ও ঘড়িয়াল:
ফারাক্কা বাঁধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অতি বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিন (Gangetic Dolphin) এবং ঘড়িয়াল (Gharial)। শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্থায়ী পানির এলাকা (Permanent water area) প্রায় ৫০% কমে যাওয়ায় এবং গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় এই প্রাণীদের চারণভূমি এবং আবাসস্থল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

জলচর পাখি ও জলাভূমি:
শীতকালে পরিযায়ী এবং স্থানীয় জলচর পাখিদের (Waterfowl) জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করা প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা অসংখ্য জলাভূমি ও চলন বিলের অংশবিশেষ স্থায়ীভাবে শুকিয়ে যাওয়ায় পাখিদের বাসস্থান ও খাদ্যসংকট চরমে পৌঁছেছে।
৪. বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বিপর্যয়জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (UNESCO) তাদের রিয়্যাক্টিভ মনিটরিং মিশন প্রতিবেদনে সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির এক নম্বর কারণ হিসেবে ফারাক্কা বাঁধকে চিহ্নিত করেছে। লবণাক্ততার বৃদ্ধি: মিষ্টি পানির প্রবাহের অভাবে খুলনা ও সুন্দরবন অঞ্চলে নদীর লবণাক্ততার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সুন্দরবনের প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে।

সুন্দরী গাছের বিলুপ্তি (Top-Dying Disease):
তীব্র লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনের প্রধান স্তম্ভ ‘সুন্দরী গাছ’ ব্যাপক আকারে ‘আগা মরা’ বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত হয়েছে। বনের ভেতরের মিঠাপানির ওপর নির্ভরশীল উদ্ভিদগুলোর স্থান দখল করছে কম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন লবণাক্ততার উদ্ভিদ, যা বনের কার্বন শোষণের ক্ষমতা (Carbon Sink) ৩০% কমিয়ে দিয়েছে

লেখক পরিচিতি:

মুহাম্মদ রাশেদ খান
সহযোগী সম্পাদক
মাসিক ইতিহাস অন্বেষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *