👁 486 Views

বগুড়া’ নয়, ‘বগড়া’ ; আমাদের আত্মপরিচয়ের লড়াই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।।বগড়া হোক।।

স্টাফ রিপোর্টার বগড়াঃ

‘বগুড়া’ নয়, ‘বগড়া’ ; আমাদের আত্মপরিচয়ের লড়াই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই জনপদের নাম এবং পরিচয় মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র রুখে দিন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনার প্রতি রইল উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র ও পুণ্ড্রবর্ধনের পুণ্যভূমি বগড়াবাসীর অকুন্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ আপনি রাষ্ট্রের হাল ধরেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজ জেলা বগড়ায় প্রথম পা’ রাখতে যাচ্ছেন। আপনি কেবল এই রাষ্ট্রের প্রধান নন, আপনি এই মাটিরই সন্তান। ফলে, এই জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বঞ্চনার কথা আপনার চেয়ে ভালো আর কেও অবগত নন।

আজ এই লেখার মাধ্যমে আমাদের প্রাণের জেলা ‘বগড়া’র নাম ও এর আদি পরিচিতি ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে আমি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই-

★ বগড়া খানের উত্তরাধিকার ও আমাদের শেকড়-

বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখি সুলতান নাসিরউদ্দীন বগড়া খানের নাম। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের সুযোগ্য পুত্র নাসিরউদ্দীন বগড়া খান ১২৮১ থেকে ১২৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই অঞ্চল শাসন করেছিলেন। ‘বলবন’ তাঁকে দিল্লির সিংহাসন গ্রহণের প্রস্তাব দিলেও, বাংলায় এসে তিনি এ অঞ্চলের প্রেমে পড়ে যান। তিনি শান্তিতে থাকতে পছন্দ করতেন, তাই- দিল্লির সুলতান হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে, আমৃত্যু এই অঞ্চলের শাসক হিসেবে জনসেবায় নিয়োজিত ছিলেন।

তাঁর শাসনকাল ছিল শান্তি, স্থিতি ও সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামোর এক অনন্য উদাহরণ। তাঁরই নামানুসারে ফার্সি উচ্চারণ অনুযায়ী এই জনপদটি পরিচিত হয়েছিল ‘বগড়া’ (Bogra) নামে। এটি কেবল একটি নাম নয়, বরং এই জনপদের মানুষের আত্মপরিচয় ও মুসলিম ঐতিহ্যের এক সুদীর্ঘ দলিল।

★ ‘বগড়া’ থেকে ‘বগুড়া’: ভাষাগত না কি সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্র?

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সময়ের আবর্তে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে সুলতান বগড়া খানের ঐতিহাসিক অবদান ও তাঁর মুসলিম পরিচয়কে জনমানস থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের শুরুর দিক পর্যন্ত সরকারি নথিপত্রে এই জেলার ইংরেজি বানান ‘Bogra’ এবং বাংলায় উচ্চারণ ‘বগড়া’ ছিলো। কিন্তু একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং হিন্দুস্তানী সংস্কৃতায়নের অভিলাষে ‘বগড়া’ শব্দটিকে কিছুটা কোমল করার অজুহাতে এ জেলার নাম বাংলা লেখায় ‘বগুড়া’ হিসেবে প্রচলন করা হয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল সুলতান বগড়া খানের প্রাপ্য স্বীকৃতি আড়াল করার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।

★ ‘Bogra’ বনাম ‘Bogura’: রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ-

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে এবং সরকারি দলিলে আমাদের এই জেলার ইংরেজি বানান ছিলো ‘Bogra’। কিন্তু ২০১৮ সালে বিগত আওয়ামীলীগ সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে প্রশাসনিকভাবে এই বানান পরিবর্তন করে ‘Bogura’ করে দেয়।

এর নেপথ্যে কাজ করেছে কুৎসিত রাজনৈতিক রেষারেষি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রশাসনের অতি দলীয়করণ এবং ফ্যাসিজমের সমালোচনা করে প্রতীকী হিসেবে গোপালগঞ্জের নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, তখন তাঁর সেই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তৎকালীন সরকার বগুড়াকে হেয় করতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান এবং আপনার রাজনৈতিক দুর্গ হওয়ার কারণে ‘Bogra’ বানানটি মুছে দেওয়ার মাধ্যমে মূলত একটি জেলার ঐতিহ্যের ওপর রাজনৈতিক কুঠারাঘাত করা হয়েছে।

এই হঠকারী পরিবর্তনের ফলে কেবল স্থানীয় মানুষের আবেগই আহত হয়নি, বরং সৃষ্টি হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি সংকট। ‘Bogra’ বানানটি একটি ব্র্যান্ডিং হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত ছিলো। হঠাৎ ‘Bogura’ করায় শিক্ষা সনদ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নথিপত্রে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তা বগুড়াবাসীর জন্য চরম অসম্মানজনক।

★★★ আমাদের দাবিঃ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বগুড়াবাসীর দাবি আজ স্পষ্ট। আমরা ইতিহাসের বিকৃতি রোধ করে সুলতান বগড়া খানের সেই হারানো শৌর্য এবং আমাদের জেলার নামের প্রকৃত রূপ ফিরে পেতে চাই।

১. প্রশাসনিক ও দাপ্তরিকভাবে ‘বগুড়া’র পরিবর্তে সুলতান বগড়া খানের নামানুসারে ‘বগড়া’ নামটির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুন।

২. জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া ইংরেজি বানান ‘Bogura’ বাতিল করে ঐতিহ্যবাহী ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বানান ‘Bogra’ ফিরিয়ে দিন।

৩. ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে সুলতান নাসিরউদ্দীন বগড়া খানের অবদান সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

৪. অনতিবিলম্বে সুলতান বগড়া খানের প্রকৃত সমাধিস্থল দাপ্তরিকভাবে চিহ্নিত করে সেখানে একটি রাজকীয় স্থাপত্যশৈলীর মাজার বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক। পাশাপাশি, ​এটিকে একটি হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষণ করা হোক।

৫. জেলার প্রবেশদ্বারগুলোতে সুলতান বগড়া খানের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও অবদান সংবলিত স্মারক ফলক স্থাপন করা হোক, যাতে আগামী প্রজন্ম তাদের শেকড় সম্পর্কে জানতে পারে।

৬. বাংলা ও ইংরেজি বানানের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ‘বগড়া’ নামের যে বিকৃতি ঘটানো হয়েছে, এর পুনরাবৃত্তি যেনো না ঘটে, এজন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে ইতিহাস পর্যালোচনা করে ‘বগড়া’ জেলার এই নামকরণের ঐতিহাসিক সত্যকে দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হোক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বগড়াবাসীর হারানো শৌর্য এবং সুলতান বগড়া খানের স্মৃতিকে প্রশাসনিক ফাইলে বন্দি না রেখে রাজপথে ও দলিলে স্বনামে ফিরিয়ে আনা হোক।
শেকড় বিচ্ছিন্ন জাতি যেমন টিকে থাকতে পারে না, তেমনি ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে একটি জনপদ এগিয়ে যেতে পারে না। আমরা বিশ্বাস করি, আপনার হাত ধরেই এই ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ দূর হবে এবং বগড়া জেলা তার প্রকৃত নামের গাম্ভীর্য, স্বকীয়তা এবং ঐতিহাসিক গৌরব ফিরে পাবে।

সচেতন বগুড়াবাসীর পক্ষে,
তারেক হাসান শেখ এর পেজ থেকেঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *