👁 338 Views

বেনাপোল কাস্টমসের এআরওকে লাথি মারার অভিযোগে দফায় দফায় বৈঠক যুগ্ম কমিশনারের কক্ষে তালা, নেমপ্লেটও নেই

ইয়ানূর রহমান : বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেডে পণ্য আনলোডের সময় কাস্টমসের আইআরএম শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আরমানকে লাথি মারার অভিযোগ উঠেছে একই দপ্তরের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়ার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিক্ষোভ ও দফায় দফায় বৈঠক চলছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা বেনাপোল কাস্টম হাউসের ইছামতি কনফারেন্স রুমে কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা (এআরও)।

বৈঠকে ৪১ নম্বর শেডের ঘটনা ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে মতামত তুলে ধরেন তাঁরা। এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে যুগ্ম কমিশনারের দপ্তরে গিয়ে তাঁর কক্ষে তালা ও নেমপ্লেট না পাওয়ায় কাস্টমস পাড়ায় নতুন করে নানা আলোচনা ও ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।

এর আগে রবিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন আরও ও এআরও পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তবে আপাতত বড় কোনো কর্মসূচিতে না যাওয়ার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে চাকরিতে এসে কর্মস্থলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে মারধরের শিকার হওয়া অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। কমিশনার তাঁদের অভিভাবক। তাঁর কাছে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

ঘটনার বিষয়ে জানতে সোমবার বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়ার দপ্তরে গেলে তাঁর কক্ষের দরজায় তালা ঝুলতে দেখা যায়। একই সঙ্গে দরজায় থাকা তাঁর নেমপ্লেটও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কাস্টম হাউসের মিডিয়া মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, ‘তিনি ছুটিতে আছেন।’
তবে ঘটনার দিন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়া অভিযোগের বিষয়ে ‘পরে কথা বলবেন’ বলে জানিয়েছিলেন। এরপর তিনি গাড়িতে করে কাস্টমস হাউস ত্যাগ করেন।

এদিকে ঘটনার দিন ৪১ নম্বর শেডে কী ঘটেছিল এবং সেখানে রক্ষিত পণ্যের বিষয়ে কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা নিয়েও অনুসন্ধান চলছে।

বেনাপোল বন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (ট্রাফিক) রুহুল আমিন বলেন, ৪১ নম্বর শেডে রক্ষিত পণ্যের মধ্যে কাস্টমস ও বন্দরের কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম আছে কি না, তা নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। তবে শেডে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল কি না, এ বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজ বাইরে প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

কাস্টমসের মিডিয়া মুখপাত্র রাহাত হোসেন জানান, ৪১ নম্বর শেডের বিষয়টি চুলচেরা বিশ্লেষণ ও ঘটনা অনুসন্ধানে কাস্টমসসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক ফাঁকি কিংবা এআরওকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে-এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না।

এআরও আরমান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার ছিল বেনাপোল কাস্টম হাউসে আরমানের বদলিজনিত শেষ কার্যদিবস।

ঘটনার দিন ঢাকার অদূরে দুই ট্রাক পণ্য আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই দুই ট্রাকের সঙ্গে ৪১ নম্বর শেডে থাকা পণ্যের কোনো সম্পর্ক নেই।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেডে আমদানি করা পণ্য আনলোডের সময় এ ঘটনা ঘটে বলে কাস্টমস সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ৪১ নম্বর শেডে আমদানি করা পণ্য আনলোডের কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে ছিলেন আইআরএম শাখার এআরও আরমান। পণ্য আনলোডের সময় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়া। একপর্যায়ে শেডের ভেতরে লোকজনের উপস্থিতিতে রাগের বশবর্তী হয়ে যুগ্ম কমিশনার তাঁকে লাথি মারেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এ সময় সেখানে থাকা কাস্টমসের সহকর্মীরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। খবরটি দ্রুত কাস্টমস হাউসে ছড়িয়ে পড়লে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। প্রতিবাদে তাঁরা পণ্য খালাস ও ছাড়করণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এতে প্রায় চার ঘণ্টা বেনাপোল কাস্টমস হাউসে আমদানি পণ্য ছাড়করণ ব্যাহত হয়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে ফিরে যান।
ঘটনাটি পরদিন শুক্রবার দিনভর কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বন্দরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

যুগ্ম কমিশনারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে রাহাত হোসেন জানান, ভুক্তভোগী এআরও আরমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে লিখিত আবেদন করেছেন।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে রাহাত হোসেন বলেন, কমিশনার সিদ্ধান্ত জানালে গণমাধ্যমকে অবহিত করা হবে।

কাস্টমসের অভ্যন্তরে দফায় দফায় বৈঠকের কারণে রাজস্ব আহরণ ও পণ্য খালাসে ব্যাঘাত ঘটছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক বৈঠক থাকতে পারে। এতে রাজস্ব আহরণের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় নেই। কাস্টমসের কাজ চলমান রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এআরও আরমান দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন কি না এবং তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটেছে কি না-দুটি বিষয়ই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ৪১ নম্বর শেডে রক্ষিত পণ্যে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা জরুরি। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোলে কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ এমন ঘটনায় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে যাতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব না পড়ে, সেজন্য দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।#