👁 487 Views

আহা! চিঠি! ​গতকাল ছিল ‘আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস’।

আহা! চিঠি!
​গতকাল ছিল ‘আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস’। এখন হয়তো চিঠির সেই আবেদন বা চিঠি লেখার চল আর নেই; কিন্তু আমাদের কৈশোর ও যৌবনের স্মৃতিজুড়ে জড়িয়ে রয়েছে চিঠিকে ঘিরে নানা গল্প আর ব্যাকুল আবেগ। একসময় দেশ-বিদেশের যোগাযোগের প্রধানতম মাধ্যমই ছিল হাতে লেখা এই চিঠি। মোবাইল ফোন, ফেসবুক বা ইমেইলের যুগে আসার আগে চিঠিই ছিল মানুষে মানুষে বন্ধনের সেতু।
​চিঠির প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি লাইনে লেপ্টে থাকত গভীর ভালোবাসা ও স্পর্শের অনুভূতি। আজকের কাঠখোট্টা মেসেঞ্জারের টেক্সট বা ইমেইলের যান্ত্রিকতায় সেই অনাবিল আবেগ খোঁজা বৃথা। সেকালে একটি চিঠির জন্য দিনের পর দিন পথ চেয়ে বসে থাকা, পিয়নের ডাকের অপেক্ষায় থাকা—একেকজনের জীবনে চিঠি যেন ছিল সবচেয়ে আকুল আর আরাধ্য বিষয়।
​জীবনের প্রথম চিঠি কবে আর কখন পেয়েছিলাম তা আজ সঠিক মনে নেই। তবে প্রথম চিঠিটি লিখেছিলাম ক্লাস টুতে পড়ার সময়—আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রিয় দিদিমণিকে। চিঠিতে ঠিক কী লিখেছিলাম আজ তা আর মনে নেই, তবে তিনি ছিলেন আমার বাল্যকালের ‘প্রথম প্রেম’। এরপর জীবনের এতটা পথ হেঁটে এলেও এতটা নির্মল ও নিষ্পাপ আবেগ নিয়ে হয়তো আর কাউকেই ভালোবাসতে পারিনি। তবে দিদিমণি অন্য কোথাও চলে যাওয়ায় আর তাঁর কোনো উত্তর পাওয়া হয়নি।
​ডাকপিয়নদের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। আমাদের বাড়িতে তাঁদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল মূলত আব্বুর সূত্রে। আব্বুর নামে দেশ-বিদেশের প্রচুর পত্রিকা ও চিঠি আসত। তা ছাড়া মামারা প্রবাসে থাকায় তাঁদের চিঠিও পৌঁছাত ডাকপিয়নের মাধ্যমেই।
​আমার নিজের নামে আসা প্রথম চিঠির প্রেরক ছিলেন মেজোমামা Md Mofizul Haque। তিনি তখন সৌদি প্রবাসী। তিনি অসম্ভব সুন্দর লিখতেন; সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার ছিল, পরিবারের প্রত্যেকের নামে আলাদা আলাদা করে আবেগমাখা চিঠি পাঠাতেন।
​এরপর হাইস্কুলে ওঠার পর বন্ধুদের দেখাদেখি ‘পত্রমিতালী’তে নাম লেখালাম। পত্রমিতালীর সৌজন্যেই পুরোদমে চিঠি লেখার অভ্যাস শুরু। তবে কলেজে ওঠার পর সেই চিঠি লেখাই রূপ নিল একধরনের ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচিতে! বন্ধুমহলে অন্যদের জন্য চিঠি লিখে দেওয়ার কাজটা আমাকেই করতে হতো। একেক ধরনের চিঠির মেজাজ অনুযায়ী আমার পারিশ্রমিকও হতো একেক রকম!
​তবে নিজের বেলায় যেগুলো লিখতাম, সেগুলোকে চিঠি না বলে ‘অনুচিঠি’ বলাই ভালো। কোনো একজন আমাকে চিঠি লেখার জন্য একটা প্যাড উপহার দিয়েছিলো, সেই প্যাডে তাঁকে কখনো চিঠি লিখেছিলাম কি না আজ আর মনে নেই। তবে আমার বেশির ভাগ চিঠিই লেখা হতো রাজনৈতিক পোস্টারের পেছনের সাদা অংশে কিংবা সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরের ফয়েলে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জীবন ‘আধুনিক’ হওয়ার আগপর্যন্ত আমার এই স্বভাবটি বজায় ছিল।
​কলেজজীবনে আমার নামে যেসব চিঠি আসত, সেগুলো আমরা চারজন মিলে গোল হয়ে পড়তাম—আমি, মা, আব্বু আর আমাদের প্রিয় শিখা Shikha Afsari।
একবার কে একজন লাল রক্ত দিয়ে চিঠি লিখে পাঠাল, আবার অন্য একজন পুরো চিঠিতে আতর-সুগন্ধি ঢেলে দিয়েছিল! মজার ব্যাপার হলো, এই দুটো চিঠিই আমাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন ঝিনাইদহ কেসি কলেজের বিশ্বস্ত বার্তাবাহক নুরু। তবে চিঠি দুটির মূল প্রেরক কে ছিলেন, তা আজ অবধি রহস্যই রয়ে গেছে। রক্তে লেখা চিঠিটা দেখে আব্বু তো বিশ্বাসই করতে চাননি যে এটা কোনো মানুষের রক্ত হতে পারে! গোটা গোটা অক্ষরে লেখা সেই চিঠিটি বহু বছর সযত্নে সংরক্ষিত ছিল আমার কাছে।
​আমি যার চিঠির জন্য সবচেয়ে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করতাম, সে ছিল আমার বরিশালের এক বন্ধু। সে কী অসাধারণ চিঠি লিখত! তার চিঠির যোগ্য উত্তর দেওয়ার জন্য আমি সারা রাত ধরে বিভিন্ন বই ঘেঁটে সুন্দর সুন্দর উক্তি (কোটেশন) খুঁজতাম।
​চিঠি তখন কেবল প্রেমের আদান-প্রদান ছিল না; জীবনের সব খবরাখবর, সব যোগাযোগই তো হতো চিঠির মাধ্যমে। বেকারের চাকরির নিয়োগপত্র বা ইন্টারভিউ কার্ড, প্রবাসে থাকা সন্তানের জন্য দেশের মায়াবি মায়ের চিঠি, জন্ম-মৃত্যুর সংবাদ—সবই আসত সেই খাঁকি খামে। এমনকি তৎকালীন পাঠ্যপুস্তকেও এর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। স্কুলে প্রায় প্রতিটি ক্লাসেই আমাদের ‘পত্র লিখন’ পড়তে হতো। জানি না আজকের দিনের পাঠ্যবইয়ে সেই অধ্যায়গুলো আর আছে কি না।
​আজ বহুদিন কেউ আর কাউকে চিঠি লেখে না, আমারও আর লেখা হয়ে ওঠে না। তবু মনের গহীনে কেমন যেন একটা আঁকুপাঁকু অনুভব করি—ইচ্ছ করে কেউ একজন চিঠি লিখুক, রঙিন খামে মোড়ানো সেই দিনগুলো আবার ফিরে আসুক!
​এই চরম যান্ত্রিক জীবনে চিঠির সেই সুবাসিত আবেগ যদি অন্তত কিছুটা হলেও ফিরে আসত, তবে মন্দ হতো না নিশ্চয়ই।
তাই চলুন, আবার চিঠি লিখি। কাউকে দেওয়ার মতো মানুষ না থাকলে অন্তত নিজের নামেই একটি চিঠি লিখুন, পোস্ট বক্সে ফেলে দিন আর নিজের ঠিকানাতেই পোস্ট হয়ে আসার আনন্দটা উপভোগ করুন!
​কবি মহাদেব সাহার সেই কালজয়ী লাইন কটি দিয়েই না-হয় শেষ করি—
​”করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙ্গুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি…”

পুরাতন লেখা, ঈষৎ পরিমার্জিত, ছবিটি অনলাইন থেকে নেয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *