👁 81 Views

সাতকানিয়া-বাঁশখালীতে ভয়াবহ পরিস্থিতি” বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৩৯ : চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায়১০ লাখ মানুষ, 

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২৩ জন (১৩ জন রোহিঙ্গা), চট্টগ্রামে ৮ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙ্গামাটিতে ২ জন মারা গেছেন। পাঁচ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার ১৬ উপজেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ২৩ হাজার ৮৫৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
সরকার বন্যাদুর্গতদের জন্য ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে।
সাতকানিয়া-বাঁশখালীতে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিঃ
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও লোহাগাড়ায় বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সরকারি হিসাবে তিন উপজেলার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়নই প্লাবিত হয়েছে এবং প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি। বাঁশখালীতেও ১৪টি ইউনিয়নে বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়েছে। দুই উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ব্যাপক ক্ষতিঃ
বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর-দিঘি ও ৩২০টি মাছের ঘের তলিয়ে গেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ২৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। মারা গেছে ২৩টি গরু, ৮৪টি ছাগল ও প্রায় ৪৩ হাজার মুরগি।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রায় ৯ হাজার হেক্টর আউশের জমি, ৬৫২ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যোগাযোগ ও জনজীবন বিপর্যস্তঃ
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে পানি ওঠায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সাতকানিয়া-বান্দরবান সড়কে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। রেললাইন পানির নিচে থাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় ত্রাণ বিতরণ ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশঃ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভিডিও কনফারেন্সে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠক করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেন। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জেলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এবং অতিরিক্ত সরকারি সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে।
পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিঃ
রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িকে পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে জামায়াত আমিরঃ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান গতকাল সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে থাকবে বলে তিনি ঘোষণা দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *