
পিরোজপুর থেকে, মোঃ হাসান তালুকদার। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের মধ্য কলারদোয়ানিয়া গ্রামে এবার ঈদ আসেনি আনন্দ হয়ে, এসেছে কান্না হয়ে।
সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের তিনটি প্রাণ। আর বেঁচে আছে শুধু ১৩ বছরের কিশোর রহমত উল্লাহ যার চোখে এখন শুধু শূন্যতা।
রহমত উল্লাহ গ্রামের বাড়িতেই থেকে পড়াশোনা করত। বাবা-মা কাজের কারণে থাকতেন ঢাকার নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায়। ঈদ এলেই বাড়ি ভরে উঠত তাদের হাসি-আনন্দে। তাই এবারও বাবা সোহাগ, মা খাদিজা বেগম আর ছোট ভাই আরমানের জন্য অধীর অপেক্ষায় ছিল সে।
সকাল থেকেই বারবার বাড়ির সামনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল রহমত উল্লাহ। হয়তো ভাবছিল, একটু পরই বাবা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলবেন কী বাবা, অনেক অপেক্ষা করছ? কিন্তু সেই অপেক্ষা ধীরে ধীরে রূপ নেয় জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নে।
গত কাল দুপুরে ঢাকা-গোপালগঞ্জ মহাসড়কের বেদগ্রাম এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তার বাবা, মা ও ছোট ভাই।
খবরটি যখন গ্রামে পৌঁছায়, তখনও কিছু বুঝতে পারেনি রহমত উল্লাহ। বাড়িতে মানুষের ভিড়, কান্না আর উৎকণ্ঠা দেখে শুধু বারবার জিজ্ঞেস করছিল আমার আব্বু-আম্মু ,ভাই কই? রাতে যখন একে একে তিনটি মরদেহ বাড়িতে পৌঁছায়, তখন পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। রহমত উল্লাহ দৌড়ে গিয়ে কাঁপা কণ্ঠে ডাকতে থাকে তার বুকফাটা আহাজারিতে উপস্থিত মানুষের চোখ ভিজে ওঠে।
ছোট ভাই আরমান ছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। একসঙ্গে খেলাধুলা, ঝগড়া, আবার কিছুক্ষণ পর মিল সবকিছুতেই ছিল গভীর ভালোবাসা। ঈদের নতুন জামা পরে দুজন একসঙ্গে ঘুরবে এই স্বপ্নই দেখছিল রহমত উল্লাহ।
স্বজনরা জানান, সোহাগ ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ। নারায়ণগঞ্জে ট্রাক শ্রমিকের কাজ করে কষ্টের টাকা দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করতেন। বড় ছেলে রহমত উল্লাহকে মানুষ করার স্বপ্নই ছিল তার সবচেয়ে বড় আশা। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সব স্বপ্ন থামিয়ে দিল।
প্রতিবেশীরা বলছেন,ছেলেটার কান্না দেখে কেউ নিজেকে সামলাতে পারেনি। একই পরিবারের তিনজন মানুষ একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সত্যিই হৃদয়বিদারক।
এবার ঈদের সকালে গ্রামের অন্য শিশুরা যখন বাবা-মায়ের হাত ধরে ঘুরতে অথবা বেড়াতে যাবে, তখন রহমত উল্লাহ হয়তো দাঁড়িয়ে থাকবে তিনটি কবরের পাশে। তার কাছে ঈদ এখন আর আনন্দ নয় ঈদ মানেই এখন না ফেরার দেশে চলে যাওয়া প্রিয় মানুষদের স্মৃতি।
রাত গভীর হলে এখনও রহমত উল্লাহ হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। হয়তো তার ছোট্ট মন এখনও বিশ্বাস করতে চায় হঠাৎ করেই দরজায় কড়া নাড়বে বাবা, মা এসে বলবেন, কাঁদিস না বাবা, আমরা চলে এসেছি।
কিন্তু বাস্তব বড় নির্মম।
যে ঘরে একসময় ঈদের হাসি ছিল, যে উঠোনে দুই ভাই দৌড়ে খেলত, সেই উঠোন আজ শূন্য। মানুষ বলে, সময় সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু ১৩ বছরের একটি শিশুর কাছে বাবার মুখ, মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙা, আর ছোট ভাইয়ের হাসি এসব কি কখনও ভোলা যায়?
এবার ঈদের চাঁদ উঠলেও রহমত উল্লাহর জীবনে আর কোনো উৎসব নামবে না। কারণ তার ছোট্ট পৃথিবীর আলো হয়ে থাকা তিনটি মানুষ আজ ঘুমিয়ে আছে পাশাপাশি তিনটি কবরে।