👁 331 Views

মসজিদ নয় পুরো হাজিরহাট অঞ্চল ভাঙন কবলে

সঞ্জয় ব্যানার্জী,পটুয়াখালী প্রতিনিধি।। পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজিরহাট আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার নাম। নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে জনপদ, ভেঙে দিচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর বিশ্বাসের ভিত্তি। এ ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক আবেগ, এক ইতিহাস, বাইতুল ফজল জামে মসজিদ।
১৯৯৪ সালে ফজলুল করিম চৌধুরী নিজের বিশ্বাস আর ভালোবাসা এবং মানুষের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার তাগিদ থেকে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই মসজিদ। সময়ের স্রোতে তিনি আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার স্বপ্ন এখনও টিকে আছে মসজিদের ইটের গাঁথুনি আর  মিনারের নীরবতায়। সেই স্বপ্ন আগলে রেখেছেন তার ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী। কিন্তু পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তেঁতুুলিয়া নদীর পশ্চিম পাশে ২ কিলোমিটার ভাঙ্গনে আজ সেই স্বপ্নকে গ্রাস করার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিও ব্যাগের নিচে মাটি সরে গিয়ে তীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। যেকোনো সময় বিলীন হয়ে যেতে পারে মসজিদটি। বাইরে থেকে স্থির মনে হলেও ভেতরে ভেতরে জমছে অজানা আতঙ্ক। প্রতিদিনের আজান যেন এখন শুধু ইবাদতের ডাক নয় বরং বাঁচিয়ে রাখার আকুতি।
এদিকে নদীর এই নির্দয় আগ্রাসনে বদলে যাচ্ছে পুরো উপজেলার মানচিত্র। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা হারিয়ে যাচ্ছে নদীর গর্ভে আর বাড়ছে মানুষের আতঙ্ক অনিশ্চয়তা ও বাঁচার আর্তনাদ। এখন প্রশ্ন একটাই, সময় থাকতে কি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, নাকি নদীর ঢেউয়ে হারিয়ে যাবে এক পিতার স্বপ্ন এক জনপদের ইতিহাস?
হাজিরহাট গ্রামের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তেঁতুলিয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনে হাজিরহাট লঞ্চঘাট, স্থানীয় মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং বাজারের অসংখ্য দোকানঘর এখন চরম হুমকির মুখে রয়েছে। ইতোমধ্যে শতাধিক বসতঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তারা আরো জানান, বর্ষা মৌসুম শুরু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। নদীর স্রোত বৃদ্ধি পেলে ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে পুরো এলাকা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। এটি শুধু নদীভাঙনের একটি ঘটনা নয় বরং হাজারো মানুষের বসতি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার সংগ্রাম। এখনই যদি কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে হাজিরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকা অচিরেই নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।
এবিষয়ে স্থানীয় যুবক সোহাগ বলেন, ‘এই মসজিদ শুধু নামাজ পড়ার জায়গা না, এটা আমাদের এলাকার আত্মা। এটা যদি নদী নিয়ে যায় আমরা কিভাবে মেনে নেব? এখনই স্থায়ী নদীশাসন ব্যবস্থা না নিলে বড় বিপর্যয় আসন্ন। কংক্রিট ব্লক, পাইলিং আর আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি।
এবিষয়ে বাইতুল ফজল জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ ওবায়দুল্লাহ জানান, অতীতে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। এখন ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পটুয়াখালী-৩(দশমিনা-গলাচিপা) আসনের সংসদ সদস্যের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এবিষয়ে বাইতুল ফজল জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতার ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী বলেন, এটা শুধু একটি মসজিদ নয়, আমাদের পরিবারের উত্তরাধিকার। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এটি রক্ষা করা বড় কঠিন।
এদিকে শুধু একটি মসজিদ নয়, পুরো হাজিরহাট অঞ্চলই এখন ভাঙনের কবলে। ইতোমধ্যে শতাধিক বসতঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দশমিনা উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ছয়টি গ্রামের সড়ক ও বেড়িবাঁধ ভেঙে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। হাজিরহাট-বাঁশবাড়িয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কও এখন হুমকির মুখে।
এ বিষয়ে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, সরেজমিনে তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী হাজিরহাট এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তিনি দেখতে পান, নদীভাঙনের ফলে এলাকার বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও জানান, হাজিরহাট দশমিনা উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ঢাকা-ভোলা জেলার সঙ্গে নদীপথে লঞ্চযোগে যাতায়াতের এটি একটি প্রধান মাধ্যম। ফলে এ এলাকাটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।###

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *