
এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রাম নগরের চারটি ওয়ার্ডে পরিচালিত এক গবেষণায় ১৮ ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) নগরের চারটি ওয়ার্ডে গবেষণা চালিয়ে এসব ঝুঁকি নিরূপণ করেছে।
চিহ্নিত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে— পাহাড়ধস, মশাবাহিত রোগ, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, গ্যাস বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, জলাবদ্ধতা, ঝিলের পানিতে ডুবে মৃত্যু, পাহাড়ি ঢল, বজ্রপাত, ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির সংকট, তাপদাহ, সড়ক দুর্ঘটনা, মাদক, পানি সংকট, পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং নালায় পড়ে মৃত্যু।
১২ মার্চ(বৃহস্পতিবার) দুপুরে নগরের একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘নগর ঝুঁকি নিরূপণ ও ঝুঁকি হ্রাস কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। পাহাড় কাটা, অনিয়ন্ত্রিত বসতি গড়ে ওঠা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নগরজুড়ে বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কমিউনিটির অভিজ্ঞতা ও মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও কমিউনিটি পর্যায়ে চিহ্নিত সব বিষয় সরাসরি গ্রহণ করা সম্ভব নয়, তবে বিশেষজ্ঞ মতামত ও কারিগরি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সিটি কর্পোরেশনের কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। কিছু ঝুঁকির কারণ নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে প্রতিকারের সুপারিশ থাকা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন। ইপসা যে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে তা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন বাস্তবায়নের পালা।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিনিধিরা বলেন, স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, ঝুঁকি ও সমস্যার বাস্তব চিত্র তারাই সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরতে পারেন। প্রতিবেদনে আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহে ত্রুটি-বিচ্যুতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির নিষ্ক্রিয়তা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এসব বিষয় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জানা গেছে, জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিস (জিএফএফও) ও ইকো হিপের অর্থায়নে, সেভ দ্য চিলড্রেনের সহায়তায় এবং রাইমসের কারিগরি সহযোগিতায় ইপসা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পাহাড়ধসপ্রবণ চারটি ওয়ার্ড—৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর, ৮ নম্বর শুলকবহর, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী এবং ১৪ নম্বর লালখানবাজারে ‘অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবন ও সম্পদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসসংক্রান্ত সতর্কবার্তা প্রণয়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রটোকল তৈরির ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি কাজ করছে।
প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণে চারটি ওয়ার্ডে একটি সমন্বিত নগর ঝুঁকি নিরূপণ প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়। এ জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক পরিদর্শন, মিশ্র গ্রুপ সেশন, কমিউনিটি দলীয় আলোচনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের সঙ্গে কী-ইনফরমেন্ট ইন্টারভিউ (কেআইআই) পরিচালনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান আইন কর্মকর্তা ও জেলা জজ মহিউদ্দিন মুরাদ, অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোয়েব উদ্দিন খান, বাংলাদেশ আবহাওয়া ও সম্প্রচার অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুর রহমান খান, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ সাহাব উদ্দিন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল আলিম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক এবং জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামাজিক উন্নয়ন কর্মকর্তা গোলাম মোর্শেদ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইপসার পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন) নাছিম বানু।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অঞ্চল ও নগর পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহজালাল মিশুক, জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, দৈনিক খবরের কাগজের ব্যুরো প্রধান ইফতেখারুল ইসলাম, দৈনিক আজাদীর সাংবাদিক মোরশেদ তালুকদার, ফিরোজশাহ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম, ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক অতিশ চাকমা, ইকবাল আজাদ, সোহানা আক্তার, ইপসার ম্যানেজার সানজিদা আক্তার এবং অরুণ দর্শী চাকমাসহ অন্যান্যরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নগর ঝুঁকি নিরূপণ কর্মপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন ইপসার প্রোগ্রাম ম্যানেজার (মনিটরিং অ্যান্ড রিসার্চ) ড. মোরশেদ হাসান মোল্লা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইপসার প্রজেক্ট অফিসার মুহাম্মদ আতাউল হাকিম।