
পটুয়াখালী প্রতিনিধি।। পটুয়াখালীর দুটি আসনে মতবিরোধ চলছিল বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে। এর জেরে তিনটি উপজেলা ও একটি পৌরসভা কমিটির কার্যক্রম বৃহস্পতিবার স্থগিত করে দেয় কেন্দ্র। এগুলো হলো-পটুয়াখালী-১ আসনের অধীন পটুয়াখালী সদর, মির্জাগঞ্জ ও দুমকী উপজেলা কমিটি এবং পটুয়াখালী পৌরসভা কমিটি। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল শনিবার বিলুপ্ত করা হয়েছে গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা কমিটি। এ দুটি উপজেলা নিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসন গঠিত।
দলের কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা চিঠিতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদিও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী উপজেলা ও পৌর কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার জেলা কমিটির। পাঁচ উপজেলা ও একটি পৌর কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আগে জানতেন না বলে দাবি করেছেন জেলা কমিটির নেতারা।
পটুয়াখালী-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী। এ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী বা প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতা নেই। তারপরও তিন উপজেলা ও পৌর কমিটির কার্যক্রম কেন স্থগিত করা হয়েছে, এর সঠিক কারণ কারও জানা নেই। কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, দায়িত্বশীল নেতারা গোপনে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করতে পারেন-এমন ধারণা থেকে কমিটি স্থগিত হয়েছে।
পটুয়াখালী-৩ আসন ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড কমিটির নেতারাও প্রকাশ্যে তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন। হাসান মামুন মনোয়নপত্র জমা দেন ২৯ ডিসেম্বর। পরদিনই তাঁকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৭ জানুয়ারি শনিবার বিলুপ্ত করা হয় দুই উপজেলা কমিটি।
সদ্য বিলুপ্ত দশমিনা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম শানু সিকদার মনে করেন, কমিটি বিলুপ্ত হওয়ায় হাসান মামুনের নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে না। মামুন তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সত্তার হাওলাদার বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর গলাচিপা বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন হাসান মামুন। তৃণমূলের সিদ্ধান্তে তিনি নির্বাচন করছেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে আছি।’
এই নেতার ভাষ্য, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে গোলাম মাওলা রনিকে এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। আমরা তাঁর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বাচন করি। নির্বাচনের পর বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা ও নির্যাতন হলেও তিনি কোনো নির্যাতিত নেতাকর্মীর খোঁজ নেননি। তখন হাসান
মামুনই বিএনপি নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি দলের দুঃসময়ে আমাদের পাশে ছিলেন, আমরাও তাঁর পাশে আছি। যত কঠোর শাস্তিই দল আমাদের দিক, আমরা মাথা পেতে নেব।’
পটুয়াখালী বিএনপির বিরোধ বেশ পুরানো। ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পর তিনি জেলার রাজনীতিতে আধিপত্য হারান। তখন আহ্বায়ক কমিটিতে পদ পান আলতাফবিরোধীরা; যার নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব স্নেহাংশ সরকার কুটি। গত বছরের ২ জুলাই ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে তিনিই সভাপতি নির্বাচিত হন। এর আগে উপজেলাসহ সব ইউনিটের কমিটিতে জায়গা পান তাঁর অনুসারীরা। পটুয়াখালী-১ আসনে স্নেহাংশু সরকার কুট্টি মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের ভাষ্য, স্নেহাংশু সরকার কুট্টি নিয়ন্ত্রিত উপজেলা কমিটিগুলো ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছিলেন না প্রার্থী আলতাফ হোসেন চৌধুরী। কেন্দ্রকে এসব অবহিত করা হলে কমিটির কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী পৌর বিএনপির সভাপতি মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘কমিটি স্থগিতের কারণ জানি না। দল এখানে আলতাফ চৌধুরীকে ধানের শীষ দিয়েছে। আমরা তাঁর পক্ষেই কাজ করব।’
আলতাফ চৌধুরীর প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মাকসুদ আহমেদ বায়েজিদ পান্না মিয়া জানান, তাদের পক্ষ থেকে কোনো কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়নি। কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়টি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় দপ্তরের এখতিয়ার।
আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের স্বার্থে কেন্দ্র যা ভালো মনে করেছে, তা-ই করছে।
জেলা বিএনপির সভাপতি স্নেহাংশু সরকার কুটি বলেন, ‘দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার বিষয়ে একটি চিঠি পেয়েছি। কেন্দ্রীয় বিএনপি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ বিষয়টিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চার কমিটিসহ আমরা সবাই আলতাফ হোসেন চৌধুরীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় কাজ করছি। তারপরও কেন এমন ঘটনা ঘটল, তা বুঝতে পারছি না। এতে সাধারণ নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হন, মনোবল হারিয়ে ফেলেন।’