
এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত, প্রায় ৫০টি ক্লিনিক নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজন
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অবকাঠামোগত ক্ষতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হওয়া এবং দীর্ঘদিন পানিতে নিমজ্জিত থাকার কারণে অনেক ক্লিনিক এখনো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উপযোগী নয়। ফলে জেলার প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলায় অনুমোদিত কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে ৫২৩টি। এর মধ্যে প্রায় ৫১৪টি চালু ছিল। তবে সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার ৮১টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় সবচেয়ে বেশি ৩১টি, বাঁশখালীতে ১৬টি এবং আনোয়ারা, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি, সন্দ্বীপ, রাউজান, সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতির মুখে পড়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বন্যার পানিতে ক্লিনিকগুলোর মেঝে ও দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে, বৈদ্যুতিক তার, পানির পাম্প, পানির ফিল্টার, টয়লেট ও আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তা বেষ্টনিও ভেঙে পড়েছে। এসব কারণে চিকিৎসাকর্মীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৫০টি কমিউনিটি ক্লিনিক নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। বাকি ক্লিনিকগুলো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সাতকানিয়া ও আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলায় বন্যার পানি ঢুকে আইপিএস, জেনারেটর, কলাপসিবল গেট ও বিভিন্ন আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সাধারণত প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের টিকাদানসহ বিভিন্ন মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। এসব সেবা ব্যাহত হওয়ায় গ্রামীণ জনপদের মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
এদিকে, বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সরকারি ওষুধ সরবরাহেও দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে ওষুধ বিতরণ করা হলেও বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় পরিচালনার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ সময়মতো না পৌঁছানোয় রোগীরা সরকারি চিকিৎসাসেবার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একসময় কমিউনিটি ক্লিনিকে ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে ২২ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। সম্প্রতি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অনেক ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু ওষুধ সংকটের কারণে এসব সেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “অপারেশন প্ল্যান পরিবর্তনের কারণে সবকিছু গুছিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগছে। কমিউনিটি ক্লিনিক এখন আলাদা ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর তালিকা তৈরি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকৌশল বিভাগে পাঠানো হয়েছে। কিছু ওষুধ মাঝেমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে, তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সময় লাগবে।”
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে মোবাইল মেডিকেল টিম ও অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক করতে ক্ষতিগ্রস্ত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর দ্রুত সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের বিকল্প নেই।