মোঃ বুলবুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ
কৃষিকাজ-অটোরিকশা চালিয়ে অতিকষ্টে পাঁচ সদস্যের সংসার চালান কুড়িগ্রামের সরকারি আবাসনের বাসিন্দা বৃদ্ধ আনছার আলী। কখনো তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন পড়েনি।
তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে রিক্রুটিং এজেন্সি খুলে বিমান টিকেটের জন্য ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করার। সেই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এক সপ্তাহ কারাগারেও আটক ছিলেন ষাটোর্ধ্ব এ ব্যক্তি।
মূলত তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠির জাতীয় পরিচয় পত্রসহ ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে অর্থ আত্মসাতের সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত বছরের ১ জানুয়ারি হতদরিদ্র আনছার আলীর ভোটার আইডি দিয়ে কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এরপর কুড়িগ্রাম কলেজ মোড়ের ঠিকানা ব্যবহার করে খোলা হয় ‘আনছার আলী এয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির।
পরে সেই এজেন্সির নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় ওমরাহ পালনের অফার দিয়ে। তা দেখে বিজ্ঞাপনে দেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার শিক্ষক আবুল হাসান।
৮ জনের সৌদি আরবে আসা-যাওয়া বিমান ভাড়া হিসাবে জনপ্রতি ৭৩ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ঠিক হয়। সেই হিসাবে আবুল হাসান রাজবাড়ী ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে গত ৯ অক্টোবর কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন।
কিন্তু তিনি তার বিমান টিকেট আর পাননি। ফলে প্রতারিত হয়ে ২০ অক্টোবর রাজবাড়ী আদালতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যক্তির নামে প্রতারণার একটি মামলা করে ভুক্তভোগী এই শিক্ষক।
সেই অ্যাকাউন্ট নম্বরের তথ্য অনুযায়ী মামলায় আনছার আলীর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং জেল হাজতে প্রেরণ করে।
ভুক্তভোগী শিক্ষক আবুল হাসান বলেন, “এজেন্সির বিজ্ঞাপনে দেওয়া নাম্বারে কথা হলে তারা আমাকে বিমানের টিকিট দেখায়। এরপর সেগুলো নিশ্চিত হয়ে তাদের দেওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাই।
“কিন্তু পরে দেখি টিকিটগুলো বাতিল করা হয়েছে। এরপর আমি বুঝতে পারি, প্রতারক চক্রের খপ্পড়ে পড়েছি। তাই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছি। তবে এই আনছার আলীকে আমি চিনি না বা এর আগে দেখা হয়নি।”
আনছার আলী বলেন, “গত নভেম্বর মাসে হঠাৎ পুলিশ এসে আমাকে নিয়ে যায়। এরপর আমি এক সপ্তাহ জেল খেটে বের হয়ে এসে জানতে পারি টাকা আত্নসাতের মামলা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে।
“আমি তো কোনো দিন পূবালী ব্যাংকে যাইনি এবং কোনো অ্যাকাউন্টও খুলিনি। ব্যাংকের ওই স্বাক্ষরও আমার নয়। আমি লেখাপড়াও জানি না। কিভাবে আমার ভোটার আইডি দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং টাকা তোলা হয়েছে তা আমি জানি না।”
“খেয়ে না খেয়ে আমাদের দিন চলে আমরা কিভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলব, প্রশ্ন এই বৃদ্ধের।
আনছার আলীর স্ত্রী ফরিদা বেগম বলেন, “বাড়ির পাশে এক বোনের গরু বিক্রি করা ৫০ হাজার টাকা এবং আরেকজনের নিকট পাঁচ হাজার টাকা ঋণ করে স্বামীকে জামিন করে আনছি। এখন ঋণের টাকা কেমনে শোধ করি কন।
“আমরা প্রতারণার শিকার। উল্টো আমার স্বামীর নামে প্রতারণার মিথ্যা মামলা।”
তার উপর মামলায় দাবিকৃত ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে তিনি বলেন, “এত টাকা টাকা শোধ করি কিভাবে? রাজবাড়ীতে মামলার হাজিরা বা দেই কিভাবে? হামরা গরিব মানুষ তিন বেলা খাবার জোটে না সেখানে এই বিপদ থেকে কিভাবে রক্ষা পাই। বিচারক কি এ গরিবের কান্না আর কষ্টের কথা বুঝবে?”
আনছার আলীর নামে ব্যাংক একাউন্ট খোলার সময় নমিনি করা হয়েছে তার বাড়ির পাশেই শিরিনা বেগমকে।
তিনি বলেন, “আনছার আলীর পরিবার এবং আমি আবাসনেই থাকি। তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আমাকে নমিনি করা হয়েছে। আমি তো এগুলোর কিছুই জানি না।
“আমার অসুস্থ স্বামী, প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে আমাদের। আমরা সবাই প্রতারণার শিকার।”
আবাসনের আরেক বাসিন্দা মজিরন বেগম বলেন, বৃদ্ধ আনছার আলী সরকারি আবাসনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিনাপাতিত করছে। গরিব অসহায় এসব পরিবারকে বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলে প্রতারক চক্ররা ভোটার আইডি নিয়ে যায়।
কুড়িগ্রাম স্টেশন ক্লাব সুপার মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক কায়েদী আজম মিলটন বলেন, “আনছার আলী এয়ার ইন্টারন্যাশনাল অফিসার্স ক্লাব মার্কেট কুড়িগ্রাম-চিলমারী রোডে যে ঠিকানা দেখানো হয়েছে তা ভুয়া। কেননা অফিসার্স ক্লাব মার্কেট নামে এখানে কোনো মার্কেট নেই।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিৎ তদন্ত করে এ প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা, বলেন এ ব্যবসায়ী নেতা।
এর আগে ২০১৬ সালে নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে ভিটেমাটিসহ তিন বিঘা কৃষি জমি হারিয়ে পাড়ি জমায় ঢাকায় আনছার আলী-ফরিদা দম্পতি। পরে ফরিদা বেগম অসুস্থ হলে ঢাকার রাস্তায় তার মাথায় পানি ঢালে দুটি শিশু।
সেই দৃশ্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের দৃষ্টি গোচর হয়।
২০১৯ সালে তৎকালীন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন আনছার আলী-ফরিদা বেগমকে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম নিয়ে এসে পুর্নবাসন করেন। সরকারি খাস জমিতে তাদের বাড়ি করে দেন এবং রিকশা কিনে দেওয়া হয়।
এবার সেই আনছার আলীকেই প্রতারকদের চক্রান্তে পড়ে বিনা অপরাধে এক সপ্তাহ কারা ভোগ করতে হয়েছে। স্ত্রী ফরিদা বেগম ঋণ করে স্বামীকে জামিনে ছাড়িয়ে আনলেও পরিবারটি এখন আরও সর্বস্বান্ত।
রাজবাড়ী জজ আদালতের আইনজীবী রঞ্জু বিশ্বাস বলেন, “রাজবাড়ী জেলা দায়রা জজ আদালতে বাদী আবুল হাসান প্রতারিত হয়ে সিআর-১২৮৫/২৫ নং একটি মামলা করেছেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।”
কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংক প্রিন্সিপাল অফিসার এ এইচ এম আলমগীর কবির বলেন, “আনছার আলীর নামে অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতারণা ঘটনা ঘটেছে তা সমাধানের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যরা ভোটার আইডি, ছবিসহ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে প্রতারণা ফাঁদে ফেলে।”
ব্যক্তিগত এসব তথ্য কাউকে প্রদানে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।