👁 411 Views

নারীর শ্রমে বদলে যাচ্ছে হবিগঞ্জের অর্থনীতি

হবিগঞ্জের প্রান্তিক এলাকায় নারীরা সংসারের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনলাইন উদ্যোগ ও গুচ্ছ উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ব্যবসা, চাকরি, প্রবাসী আয়, এসএমই ব্যবসা ও নানা সেবা খাতে যুক্ত হচ্ছেন। এর মাধ্যমে জেলার অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসছে।

২০২২ সালের আদমশুমারির অনুযায়ী, হবিগঞ্জের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৬। এর মধ্যে নারী অর্ধেকের বেশি—১২ লাখ ১৪ হাজার ৪২৯ জন। তাঁদের মধ্যে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকারী নারী ৪২ শতাংশের একটু বেশি।

চা–বাগানের নারীরা

হবিগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ চা উৎপাদন অঞ্চল। এ জেলায় ২৩টি চা-বাগান আছে। এ বাগানগুলো থেকে বছরে দেশের মোট উৎপাদনের ২২ শতাংশ আসে। চা উৎপাদনে যুক্ত শ্রমশক্তির ৬০–৭০ ভাগই নারী।

হবিগঞ্জের নালুয়া চা–বাগানের শ্রমিক মিতা রানী ত্রিপুরা (৪৫) গত এক দশকে বাগানের সহকর্মীদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। একসময় তাঁর দৈনিক পাতা তোলা ছিল ২০–২২ কেজি। পরিবারের অভাব, সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খরচ—সব চাপের মধ্যেও থেমে থাকেননি তিনি। ধীরে ধীরে হাত পাকিয়ে এখন দিনে ৪০–৪৫ কেজি পর্যন্ত চা-পাতা তুলতে পারেন। দক্ষতা ও নিষ্ঠার কারণে বাগান কর্তৃপক্ষ তাঁকে ইতিমধ্যে একাধিকবার ‘মাসের সেরা শ্রমিক’ হিসেবে সম্মান জানিয়েছে।

শুধু নিজের উন্নতি নয়, মিতা বাগানের অন্য নারী শ্রমিকদেরও শেখান কীভাবে দ্রুত ও ভালো মানের পাতা তোলা যায়। তাঁর আয় দিয়ে দুই সন্তানকে স্কুলে পড়াচ্ছেন, স্বামীকে ছোট ব্যবসা শুরু করতে সহায়তা করেছেন। তাঁর মতো চা–বাগানের আরও অনেক নারী শ্রমিক জীবনে পরিবর্তন আনছেন।

কৃষিতে নারীর সফলতা

কৃষি উৎপাদন, বীজতলা তৈরি, ধান মাড়াই, সবজি চাষ—এসব কাজে যুক্ত হয়ে নারীরা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, হবিগঞ্জে নারীদের প্রায় ২৬ ভাগ কৃষিকাজে যুক্ত। তাঁদের শ্রমের মধ্য দিয়ে জেলার গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি টিকে আছে।

এমন এক নারী মিন্নি আক্তার। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রিচি গ্রামের এই নারী কৃষক শুরুতে শুধু ধান চাষ করতেন। অর্থনৈতিক চাপ ও সন্তানের পড়াশোনার খরচের কারণে মিন্নি নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি ধানের পাশাপাশি সবজি, ফুল ও হর্টিকালচারাল ফসল চাষ শুরু করেন। হোমস্টেড পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগি, মাছ চাষ ও শাকসবজি একসঙ্গে ফলিয়ে মিন্নি তাঁর আয় বাড়ান। স্থানীয় মহিলা কৃষক সমিতিতে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি অন্য নারীদেরও প্রশিক্ষণ দেন। বীজ সংরক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ শেখান। নিজের শ্রম ও কৌশলের ফলে মিন্নি আজ দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে সক্ষম, ছোট ব্যবসা শুরু করেছেন তাঁর স্বামী।

হাজারো নারীর জীবনে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে শায়েস্তাগঞ্জে অবস্থিত প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। এই শিল্প পার্কে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার নারী কর্মী কাজ করছেন। এর বেশির ভাগই হবিগঞ্জের। এখানে কর্মরত নারীদের কেউ বিধবা, কারও বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, কেউ পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম, আবার কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কাজে এসেছেন।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *