প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ১, ২০২৬, ১০:০৫ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ১, ২০২৬, ৬:৪৮ পি.এম

লেখক : মুহাম্মদ রাশেদ খান
সুতা আমদানিতে শুল্ক বা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে স্পিনিং মিলগুলো ন্যায্য সুরক্ষা ও টিকে থাকার লড়াইয়ে সুবিধাটি বাতিলের পক্ষে রয়েছে, অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি) উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কায় এর তীব্র বিরোধিতা করছে। দেশীয় স্পিনিং মিল ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের সম্ভাব্য পরিণতি:
স্থানীয় স্পিনিং মিলের জন্য ইতিবাচক:
শুল্ক ও বন্ড সুবিধা বাতিল হলে বা প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাবে। বর্তমানে সস্তা বিদেশি (বিশেষ করে ভারতীয়) সুতার আগ্রাসনে লোকসান ও অবিক্রীত সুতার স্তূপের যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে এটি সাহায্য করতে পারে।
পোশাক শিল্পের জন্য নেতিবাচক প্রভাব:
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের মতে, আমদানিকৃত সুতার ওপর শুল্ক কার্যকর হলে প্রতি কেজি সুতায় অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি পাবে। এতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পোশাকের দাম বেড়ে গিয়ে রপ্তানি আদেশ (অর্ডার) হারানোর গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হবে।
চরম শিল্প সংকট ও অস্থিরতা:
স্থানীয় বস্ত্রকল মালিকরা বন্ড সুবিধা বাতিলের দাবি বাস্তবায়ন না হলে মিল বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। বিপরীতে পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ শুল্কারোপের বিপক্ষে। এতে পুরো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।
শুল্ক প্রত্যাহারের প্রভাব মোকাবিলায় সম্ভাব্য উপায়সমূহ:
যৌক্তিক সমাধান:
শুল্ক বসানোর পরিবর্তে স্পিনিং মিলগুলোকে সরাসরি প্রণোদনা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কর রেয়াতের মতো সুবিধা দেওয়ার জন্য পোশাক খাতের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে।
ব্যালেন্স তৈরি:
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান ঠিক রাখতে দুই খাতের (টেক্সটাইল ও আরএমজি) স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট কিছু সুতার বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে এবং বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও অংশীজনদের সাথে সমন্বয়ের কাজ চলছে। স্থানীয় স্পিনিং মিলের সুরক্ষা এবং তৈরি পোশাক খাতের (RMG) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য সরকার ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছে। সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও নীতিগত সিদ্ধান্তের বিশদ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতার বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশদেশীয় বস্ত্রকলগুলোকে ভারতের সস্তা সুতার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) সুনির্দিষ্ট কিছু সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা স্থগিতের অনুরোধ জানিয়েছে।
নির্দিষ্ট কাউন্ট:
প্রধানত নিটওয়্যার তৈরিতে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের (মিডিয়াম থেকে কোর্স) সুতার ওপর বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
শুল্কের প্রভাব:
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বন্ড সুবিধার বাইরে গিয়ে আমদানিকারকদের প্রায় ৩৭% থেকে ৩৯% পর্যন্ত শুল্ক গুণতে হতে পারে। তবে রপ্তানির পর আমদানিকারকরা ‘ডিউটি ড্র-ব্যাক’ বা শুল্ক ফেরতের সুবিধা পাবেন।
২. আমদানি নীতি আদেশ ২০২৫-২০২৮ এর খসড়া অনুমোদনবাণিজ্য সহজীকরণ ও সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে সরকার নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৫-২০২৮ (Import Policy Order) অনুমোদন করেছে।
এই আদেশের অধীনে তৈরি পোশাকসহ (RMG) ৫টি প্রধান রপ্তানিমুখী খাতকে তাদের কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি দ্রুত কার্গো খালাস এবং ইলেকট্রনিক কর আদায়ের মতো প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৩. বন্ড ব্যবস্থার সরলীকরণ এবং নীতি সম্প্রসারণসরকার ব্যবসা পরিচালন ব্যয় (Cost of Doing Business) কমাতে সামগ্রিক বন্ড নীতিতে পরিবর্তন আনছে।অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে শুধু তৈরি পোশাক খাত নয়, চামড়া, জাহাজ নির্মাণ এবং অলঙ্কার শিল্পের মতো অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতের জন্যও বন্ড সুবিধা সহজ ও প্রসারিত করা হচ্ছে। একই সাথে বন্ড লাইসেন্স বা অডিট সংক্রান্ত আমলাতান্ত্রিক হয়রানি বন্ধের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
৪. বিজিএমইএ-বিকেএমইএ বনাম বিটিএমএ দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়ের চেষ্টাসরকারের এই বন্ড প্রত্যাহারের উদ্যোগের পর বস্ত্র ও পোশাক খাতের দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায়।
পোশাক রপ্তানিকারকদের (বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ) দাবি:
তারা সরকারকে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করার অনুরোধ জানিয়েছে। তাদের বিকল্প প্রস্তাব হলো, সুতার আমদানির ওপর শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে স্পিনিং মিলগুলোকে সরাসরি নগদ প্রণোদনা, কর রেয়াত এবং স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হোক।
বস্ত্রকল মালিকদের (বিটিএমএ) অবস্থান:
তারা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মিল বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে দ্রুত এই সুপারিশ বাস্তবায়নের চাপ দেয়。
বর্তমান পরিস্থিতি:
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং এনবিআর কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত না নিয়ে উভয় পক্ষের (পোশাক খাতের ক্রেতা ও সুতা উৎপাদনকারী) স্বার্থ রক্ষা করে একটি মধ্যপন্থী সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছে, যাতে দেশের প্রধান রপ্তানি আয় ঝুঁকির মুখে না পড়ে।
উপসংহার:
সুতা আমদানিতে শুল্ক বা বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের বিতর্কটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) ও বস্ত্র (Textile) শিল্পের মধ্যকার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে সচল ও টেকসই রাখতে হলে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব নয়।মূল সারসংক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা:
শিল্পের ভারসাম্য রক্ষা:
স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যেমন ভারতীয় বা বিদেশি সস্তা সুতার অসম প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, তেমনি তৈরি পোশাক খাতের বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার জন্য কম খরচে কাঁচামাল পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি।
সরাসরি সহায়তার গুরুত্ব:
সুতা আমদানিতে সরাসরি শুল্ক আরোপ করার চেয়ে পোশাক খাতের প্রস্তাব অনুযায়ী—দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, কর রেয়াত বা বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর ও ঝুঁকিমুক্ত বিকল্প হতে পারে।
যৌথ নীতি নির্ধারণ:
সরকার, বিটিএমএ (BTMA), বিজিএমইএ (BGMEA) এবং বিকেএমইএ (BKMEA)-এর সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমেই কেবল একটি মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান বের করা সম্ভব, যা সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ব্যাহত না করে দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকেও শক্তিশালী করবে।
লেখক
মুহাম্মদ রাশেদ খান
সহযোগী সম্পাদক
মাসিক ইতিহাস অন্বেষা