প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২৪, ২০২৬, ২:১৭ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ২৪, ২০২৬, ১২:২১ এ.এম

লেখক : হাম্মদ রাশেদ খান
ইসলামি শরিয়তের মৌলিক নীতিমালার আলোকে সমসাময়িক বিশ্বের প্রায় সমস্ত শীর্ষস্থানীয় ফতোয়া বোর্ড এবং ওলামায়ে কেরাম একে হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। নিচে কুরআন, হাদিস এবং ফিকাহ (আইনগত) রেফারেন্সসহ এর বিস্তারিত পর্যালোচনা ও প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হলো:
১. স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও আত্মহনন (কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স):
ধূমপান ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানা মারাত্মক ব্যাধি সৃষ্টি করে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। ইসলামে নিজেকে স্বেচ্ছায় ধ্বংস করা বা ধীরগতির আত্মহত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কুরআনের দলিল ১:
“তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৯৫)
কুরআনের দলিল ২:
“আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৯)
হাদিসের দলিল:
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:"ইসলামে নিজের ক্ষতি করা এবং অন্যের ক্ষতি করা—কোনোটিই জায়েজ নেই।" (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং- ২৩৪০; মুয়াত্তা ইমাম মালিক, হাদিস নং- ৩১)
২. অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তু বর্জন (কুরআনের রেফারেন্স):
ইসলামে মানবজাতির জন্য যা কিছু ভালো ও পবিত্র তা হালাল করা হয়েছে, আর যা কিছু নোংরা, অপবিত্র ও ক্ষতিকর তা হারাম করা হয়েছে। ধূমপান স্পষ্টতই একটি ক্ষতিকর ও দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু।কুরআনের দলিল:"(নবী) তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তুসমূহ তাদের ওপর হারাম করেন।" (সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৫৭)
৩. সম্পদের অপচয় ও অপব্যয় (কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স):
ধূমপানের পেছনে অর্থ ব্যয় করা সম্পূর্ণ নিরর্থক এবং এটি সম্পদের অপচয়, যা শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
কুরআনের দলিল ১:
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৭)
কুরআনের দলিল ২:
“আর তোমরা অপব্যয় করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।" (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৪১)
হাদিসের দলিল:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"কিয়ামতের দিন কোনো বান্দা চারটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক কদমও নড়তে পারবে না... তার মধ্যে একটি হলো—সে তার ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোন পথে তা ব্যয় করেছে।" (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস নং- ২৪১৭)
৪. ফেরেশতা ও সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়া (হাদিসের রেফারেন্স):
ধূমপায়ীর মুখের দুর্গন্ধ তার আশেপাশের মানুষ এবং ইবাদতরত মুসল্লিদের জন্য কষ্টের কারণ হয়। ইসলামে কাউকে কষ্ট দেওয়া গুনাহের কাজ।
হাদিসের দলিল ১:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"যে ব্যক্তি রসুন বা পেঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে এবং তার ঘরে বসে থাকে। কারণ, মানুষ যে জিনিসে কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও সেই জিনিসে কষ্ট পায়।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ৮৫৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ৫৬৪)(ইসলামি গবেষকদের মতে, ধূমপানের দুর্গন্ধ কাঁচা পেঁয়াজ-রসুনের চেয়েও তীব্র ও স্থায়ী, তাই এর নিষেধাজ্ঞা আরও জোরালো।)
হাদিসের দলিল ২:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ১০)
সমসাময়িক ফতোয়া বোর্ডের সিদ্ধান্তসমূহ (ফিকাহ রেফারেন্স):
তামাকের ভয়াবহ ক্ষতি ও নেশাজাতীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বের বড় বড় ইসলামিক গবেষণা কেন্দ্র ও ফতোয়া বোর্ড ধূমপানকে স্পষ্ট 'হারাম' ঘোষণা করেছে:
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (Lajnah Daimah):
তারা পরিষ্কার ফতোয়া দিয়েছেন যে, ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব, অপচয় এবং দুর্গন্ধের কারণে এটি খাওয়া, কেনা এবং বিক্রি করা সম্পূর্ণ হারাম। (ফতোয়া নং- ৪৯৬৯)
মিশরের দারুল ইফতা (Dar al-Ifta al-Misriyyah):
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে মিশরের রাষ্ট্রীয় ফতোয়া বোর্ড ধূমপানকে সম্পূর্ণরূপে হারাম (নিষিদ্ধ) ঘোষণা করেছে।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় (মিশর):
আল-আজহারের ফতোয়া কমিটি ধূমপানকে হারাম এবং এর ব্যবসা থেকে উপার্জিত আয়কে অবৈধ বলেছে।
আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি (OIC):
জেদ্দায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মুসলিম বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফকিহগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, ধূমপান মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিধায় এটি বর্জন করা ওয়াজিব এবং এটি হারাম।
সম্পদের অপচয়:
ইসলামে অহেতুক সম্পদের অপচয় করা হারাম। কোরআনে অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই বলা হয়েছে (সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৭)। ধূমপানের পেছনে অর্থ ব্যয় কেবল অপচয়ই নয়, বরং তা একটি ক্ষতিকর নেশার পেছনে নিজের অর্থ পুড়িয়ে ফেলা।
দুর্গন্ধ ও কষ্ট দেওয়া:
হাদীস অনুযায়ী, দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু খেয়ে মসজিদে প্রবেশ করতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ এতে ফেরেশতা ও অন্য মুসল্লিদের কষ্ট হয়। ধূমপানের ফলে মুখ, কাপড় ও নিঃশ্বাসে যে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, তা অন্যদের জন্য মারাত্মক বিরক্তির কারণ।
অন্যান্য মাযহাব ও ফতোয়াহানাফি, শাফেয়ী ও হাম্বলী ফতোয়া:
অনেক প্রাচীন আলেম ধূমপানকে মাকরূহ বললেও, আধুনিক যুগে তামাকের ক্ষতিকর দিক প্রমাণিত হওয়ার পর অধিকাংশ ফতোয়া বোর্ড (যেমন- সৌদি ফতোয়া কমিটি, মিশরের দারুল ইফতা) একে হারাম ঘোষণা করেছে।
ধূমপানের শাস্তি:
যদিও নির্দিষ্ট কোনো দণ্ডবিধি নেই, তবে জেনেশুনে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা এবং হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে এবং তওবা করতে হবে।
প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার ও স্কলারদের ঐকমত্যের (ইজমা) ভিত্তিতে ধূমপান থেকে বিরত থাকা একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এই বদভ্যাস ত্যাগে সহায়তা পেতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কিংবা স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
তামাক চাষ ও তামাক জাত পণ্য উৎপাদনও হারাম:
ইসলামি শরিয়তের ফিকহী বা আইনি মূলনীতি অনুযায়ী, যে বস্তুর ব্যবহার হারাম, তার চাষাবাদ, উৎপাদন, কেনাবেচা এবং সেই কাজে সহযোগিতা করাও হারাম. যেহেতু তামাক ও তামাকজাত পণ্য (সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল ইত্যাদি) মানুষের স্বাস্থ্য ও সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ইসলামে নিষিদ্ধ, তাই এর কাঁচামাল চাষ করা এবং তা দিয়ে পণ্য উৎপাদন করাও সম্পূর্ণ অবৈধ.নিচে কুরআন, হাদিস এবং সমসাময়িক ফতোয়ার আলোকে এর সপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণসমূহ উপস্থাপন করা হলো:
১. মূল ফিকহী নীতি (হাদিসের রেফারেন্স):
ইসলামি আইনের একটি সুপরিচিত নিয়ম হলো, আল্লাহ যখন কোনো বস্তু সেবন বা ব্যবহার হারাম করেন, তখন তার ব্যবসা ও মূল্যকেও হারাম করে দেন.
হাদিসের দলিল:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা যখন কোনো জাতিকে কোনো কিছু খাওয়া হারাম করেন, তখন তার মূল্য (বেচাকেনা থেকে অর্জিত আয়) খাওয়াও তাদের জন্য হারাম করে দেন।" (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং- ৩৪৮৮; সহিহ ইবনে হিব্বান)
২. অন্যায় ও পাপের কাজে সহযোগিতা নিষেধ (কুরআনের রেফারেন্স):
তামাক চাষ করা এবং সিগারেট বা জর্দার মতো ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদন করার অর্থ হলো মানুষকে গুনাহ এবং আত্মহননের দিকে ঠেলে দেওয়া। কুরআন শরীফে অন্যায় কাজে একে অপরকে সাহায্য করতে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে।
কুরআনের দলিল:
“তোমরা সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না।" (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ২)
৩. মানবজাতির ক্ষতির কারণ হওয়া (হাদিসের রেফারেন্স):
তামাক চাষের মাধ্যমে সমাজে একটি ধীরগতির বিষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা লাখ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ. ইসলামে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের ক্ষতির কারণ হওয়া নিষিদ্ধ।
হাদিসের দলিল:
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:"কারো ক্ষতি করা যাবে না এবং নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না।" (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং- ২৩৪০)
সমসাময়িক শীর্ষস্থানীয় ফতোয়া বোর্ডের সিদ্ধান্তবিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফকিহ এবং ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারগুলো তামাক চাষ ও উৎপাদনের ব্যাপারে স্পষ্ট ফতোয়া দিয়েছেন:
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (Lajnah Daimah):
তারা স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, "তামাক চাষ করা, তা বিক্রি করা বা এর ব্যবসা করা কোনোটিই জায়েজ নেই। কারণ এটি ক্ষতিকর ও অপবিত্র বস্তু। মুসলমানদের উচিত এই চাষ থেকে দূরে থাকা।" (ফতোয়া ভলিউম-১৩, পৃষ্ঠা-৫৫)
আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি (OIC):
তামাক চাষকে কৃষিখাতের জন্য একটি ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিকল্প ফসল চাষের তাগিদ দিয়েছে এবং এর বাণিজ্যিক উৎপাদনকে হারাম ঘোষণা করেছে.
দারুল ইফতা (মিশর):
তামাক থেকে উৎপাদিত যেকোনো ক্ষতিকর নেশাজাতীয় পণ্যের ফ্যাক্টরি বা কারখানায় চাকরি করা এবং তা থেকে উপার্জিত আয়কেও অবৈধ বলেছে।
সুতরাং, তামাক চাষ এবং এর ফ্যাক্টরি বা ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ সম্পূর্ণ হারাম ও অবৈধ। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো তামাকের বিকল্প হিসেবে কোনো হালাল ফসল বা বৈধ পণ্যের ব্যবসা বেছে নেওয়া।
তামাকের বিকল্প হালাল কৃষিপণ্য বা তামাক চাষিদের পুনর্বাসনে ইসলামিক ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ:
তামাক চাষ বাদ দিয়ে হালাল ও লাভজনক কৃষিপণ্য গ্রহণ এবং তামাক চাষিদের পুনর্বাসনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। নিচে এর একটি বিস্তারিত রূপরেখা দেওয়া হলো:
১. তামাকের বিকল্প হালাল ও লাভজনক কৃষিপণ্যতামাক যে ধরনের মাটিতে জন্মায়, সেখানে অনেক উচ্চমূল্যের ও লাভজনক হালাল ফসল চাষ করা সম্ভব। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, তামাকের চেয়েও এসব ফসলে দীর্ঘমেয়াদে বেশি মুনাফা পাওয়া যায়:
উচ্চমূল্যের মসলা জাতীয় ফসল:
পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ এবং মরিচ। বর্তমানে বাজারে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা ও ভালো দাম রয়েছে।
ডাল ও তৈলবীজ:
সরিষা, সূর্যমুখী, চিনা বাদাম, মুগ ডাল এবং মসুর ডাল। তামাকের জমিতে এগুলো খুব ভালো জন্মে।
শীতকালীন ও বারোমাসি সবজি:
বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, আলু, বেগুন এবং পটল।
ফল চাষ:
মাল্টা, পেয়ারা, ড্রাগন ফল এবং বড়ই (কুল)। বর্তমানে বাণিজ্যিক ফল চাষ তামাকের চেয়েও অনেক বেশি লাভজনক।
ভুট্টা ও গম:
তামাকের বিকল্প হিসেবে তামাক উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে (যেমন: কুষ্টিয়া, লালমনিরহাট, বান্দরবান) ভুট্টা চাষ অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়েছে।
২. ইসলামিক পদক্ষেপ ও পুনর্বাসন:
ইসলাম শুধু কোনো কিছু হারাম করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং তার বিকল্প ও পুনর্বাসনের পথও দেখায়।
তামাক চাষিদের সুরক্ষায় ইসলামিক সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বসমূহ:
যাকাত ও কর্জে হাসানা (সুদহীন ঋণ):
ইসলামিক রাষ্ট্র বা বায়তুল মাল (কিংবা বেসরকারি যাকাত ফান্ড) থেকে তামাক চাষিদের এককালীন পুঁজি বা সুদহীন ঋণ দেওয়া, যাতে তারা তামাকের ক্ষতিকর দাদন ব্যবসা (Advance সইসাব) থেকে মুক্ত হয়ে বিকল্প হালাল ফসল চাষ শুরু করতে পারেন।
উদ্বুদ্ধকরণ ও সচেতনতা:
মসজিদের ইমাম ও খতিবদের মাধ্যমে জুমার খুতবায় তামাক চাষের দুনিয়াবী ও পরকালীন ক্ষতি এবং হালাল উপার্জনের বরকত সম্পর্কে কৃষকদের নিয়মিত সচেতন করা।
ইসলামিক ব্যাংকিং সুবিধা:
ইসলামিক ব্যাংকগুলো কৃষকদের জন্য বিশেষ 'মুদারাবাহ' বা 'মুরাবাহা' ভিত্তিক কৃষি বিনিয়োগ সুবিধা দিতে পারে, যা শুধু হালাল ফসল চাষের জন্যই বরাদ্দ থাকবে।
৩. রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও পুনর্বাসন (বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট):
বাংলাদেশ সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে 'তামাকমুক্ত' করার ঘোষণা দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে এবং কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করছে ও করতে পারে:
প্রণোদনা ও ঋণ সহায়তা:
তামাক ছেড়ে বিকল্প ফসল (যেমন: ভুট্টা বা সরিষা) চাষ শুরু করা কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার এবং স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ দেওয়া।
তামাক কোম্পানির দাদন প্রথা বন্ধ করা:
তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের অগ্রিম টাকা, সার ও বীজ দিয়ে তামাক চাষে বাধ্য করে। রাষ্ট্র আইন করে এই অগ্রিম দাদন দেওয়া বন্ধ করতে পারে।
বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণ সুবিধা:
বিকল্প ফসলের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগে ক্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং হিমাগার (Cold Storage) সুবিধা বৃদ্ধি করা।
উচ্চ কর আরোপ:
তামাক পাতা রপ্তানি ও বিক্রির ওপর উচ্চ হারে শুল্ক বা কর (যেমন: পরিবেশ উন্নয়ন সারচার্জ) আরোপ করা, যাতে কৃষকরা তামাক চাষে নিরুৎসাহিত হন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তদারকি:
মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের হাতে-কলমে তামাকের বিকল্প ফসল চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
কৃষকদের ক্ষতিকর তামাক চাষ থেকে ফিরিয়ে আনতে ইসলামিক আদর্শের নৈতিক অনুপ্রেরণা এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার সমন্বয় সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
বিকল্প ফসল চাষের নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্প:
২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণ তামাকমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা নির্দিষ্ট কিছু সরকারি প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তামাক চাষিদের পুনর্বাসন এবং বিকল্প ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করতে নিচে উল্লেখযোগ্য কিছু সরকারি উদ্যোগ ও প্রকল্প তুলে ধরা হলো:
১. তামাকের বিকল্প নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্প (PKSF):
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) সরকারি অর্থায়নে "তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প ফসল উৎপাদন ও বহুমুখী আয়ের উৎস সৃষ্টি" শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্প পরিচালনা করছে।
মূল উদ্দেশ্য:
তামাক চাষিদের সম্পূর্ণভাবে তামাক মুক্ত করে টেকসই খাদ্য উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা।
কার্যক্রম:
কৃষকদের টমেটো, অমৌসুমী তরমুজ, পেঁয়াজ, বেগুন, ফুলকপি, ও কাশ্মিরি আপেলকুল চাষের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, বীজ, জৈব সার ও বালাইনাশক দেওয়া হয়।
সাফল্য:
এই প্রকল্পের আওতায় মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা বিকল্প ফসল চাষ করে তামাকের চেয়ে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি আয় করছেন।
২. কৃষি পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কর্মসূচি (কৃষি মন্ত্রণালয়):
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় তামাক চাষপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ প্রণোদনা প্রকল্প হাতে নিয়েছে:
আখ চাষ বৃদ্ধি প্রকল্প:
তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে ও জমিগুলো আবাদের আওতায় আনতে "জেলা কৃষি পুনর্বাসন কমিটির" মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে আখের চারা ও সার বিতরণ করা হচ্ছে।
গমের আবাদ সম্প্রসারণ:
তামাকের জমিতে গমের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ বীজ ও উপকরণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
৩. জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি ও ক্রপ জোনিং (স্বাস্থ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়):
সরকার "Tobacco Cultivation Control Policy" (তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা) এর আলোকে তামাকের যোগান ও চাষ কমাতে কাজ করছে।
ক্রপ জোনিং (Crop Zoning) পদ্ধতি:
এই সরকারি পরিকল্পনার মাধ্যমে তামাকপ্রবণ জমির উর্বরতা ও পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে তামাকের পরিবর্তে ভুট্টা, ডাল ও তেলবীজ চাষ বাধ্যতামূলক বা উৎসাহিত করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, চরাঞ্চলগুলোতে তামাকের চাষ প্রায় ৯৫% কমিয়ে সেখানে সফলভাবে ভুট্টা চাষ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় ভৌগোলিক নিষেধাজ্ঞা:
সরকারি গেজেটের মাধ্যমে দেশের পরিবেশগত সংবেদনশীল এলাকা এবং হালদা নদীর তীরবর্তী নির্ধারিত অঞ্চলে সব ধরনের তামাক চাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
৪. স্মার্ট কৃষক কার্ড ও উপকরণ ভর্তুকি:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) মাধ্যমে তামাক ছেড়ে দেওয়া প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে "কৃষক কার্ড" বিতরণ করা হচ্ছে।
এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ১০টি সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন:
বিকল্প হালাল ফসল চাষের জন্য সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকারি আর্থিক ভর্তুকি।
স্বল্পমূল্যে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং সেচ সুবিধা। বিনা সুদে বা সহজ শর্তে রাষ্ট্রীয় কৃষি ঋণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ফসল বীমা সুবিধা। আপনার এলাকার উপজেলা কৃষি অফিস বা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে তামাক চাষিরা সরাসরি এই সরকারি প্রকল্পগুলোর অধীনে বীজ, সার এবং নগদ প্রণোদনা সহায়তার আবেদন করতে পারেন।
লেখক
মুহাম্মদ রাশেদ খান
সহযোগী সম্পাদক
মাসিক ইতিহাস অন্বেষা