প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ৩:২৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ৫, ২০২৬, ১১:৪৯ পি.এম

মুহাম্মদ রাশেদ খান
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও নির্মাণ খাতে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং বা প্রাক-প্রকৌশল ভবন (PEB) এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছে। বর্তমানে দেশের ৯৯% ফ্যাক্টরি শেড এবং বৃহদাকার বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো এই প্রযুক্তিতে নির্মিত হচ্ছে। দেশের নির্মাণ শিল্পের আধুনিকায়নে ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে খাতটির অবদান অনস্বীকার্য।
নির্মাণ শিল্পে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং-এর অবদান:
সময় সাশ্রয়ী নির্মাণ:
প্রচলিত ইট-সিমেন্টের (RCC) কাঠামোর তুলনায় এই পদ্ধতিতে নির্মাণ কাজ ৫০% পর্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়। যেখানে একটি বহুতল ভবন তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লাগে, সেখানে স্টিল স্ট্রাকচারে তা কয়েক মাসের মধ্যে প্রস্তুত করা সম্ভব।
সাশ্রয়ী ও টেকসই:
কারখানাগুলোতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে যন্ত্রাংশ তৈরি হওয়ায় নির্মাণ সামগ্রীর অপচয় রোধ হয়। দীর্ঘস্থায়ীত্বের পাশাপাশি এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক কম এবং ভূমিকম্প ও ঘূর্ণিঝড় সহনশীল।
স্থানান্তরযোগ্যতা:
প্রি-ফেব্রিকেটেড কাঠামোর অন্যতম বড় সুবিধা হলো এগুলো প্রয়োজনে নাট-বোল্ট খুলে অন্য স্থানে স্থানান্তর বা পুনর্ব্যবহার করা যায়।
শিল্পায়নে অবদান ও বর্তমান বাজার:
দ্রুত শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান:
তৈরি পোশাক কারখানা (RMG), স্পিনিং মিল, ফার্মাসিউটিক্যালস, পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং কোল্ড স্টোরেজ দ্রুত চালু করার ক্ষেত্রে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল অপরিহার্য। এটি দ্রুত উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং বিপুল কর্মসংস্থান তৈরিতে সরাসরি সহায়তা করছে।
বিশাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি:
খাত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল শিল্পের বাজার আকার ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বার্ষিক টার্নওভার ৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে দাঁড়িয়েছে এবং খাতটি প্রতি বছর প্রায় ২০% হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
পরনির্ভরশীলতা হ্রাস:
বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৯০-১০০% প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল স্থানীয় কারখানাসমূহ (যেমন- কনফিডেন্স, ম্যাকডোনাল্ড, পিইবি স্টিল অ্যালায়েন্স ইত্যাদি) নিজস্ব প্রযুক্তিতে সরবরাহ করছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
এছাড়া পরিবেশবান্ধব (Green Building) নির্মাণ ধারণা বাস্তবায়নে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল সিস্টেম অত্যন্ত কার্যকর, যা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে।
এই প্রযুক্তিগত শিল্পের ইতিহাস:
বাংলাদেশে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং বা প্রাক-প্রকৌশল ভবন (PEB) শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভর করে ১৯৮৫ সালে, যা বিগত চার দশকে সম্পূর্ণ দেশীয় ও স্বনির্ভর একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পে রূপান্তর লাভ করেছে।ধাপে ধাপে এই শিল্পের বিবর্তনের ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সূচনা পর্ব ও বিদেশি নির্ভরতা (১৯৮৫ – ২০০০):
প্রথম আগমন (১৯৮৫):
বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচারের ব্যবহার শুরু হয়। প্রাথমিক অবস্থায় দেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের দ্রুত বিকাশের স্বার্থে এই প্রযুক্তি আনা হয়েছিল।
শতভাগ আমদানি:
শুরুতে বাংলাদেশে নিজস্ব কোনো উৎপাদন কারখানা ছিল না। বহুজাতিক কোম্পানি (যেমন: জামিল স্টিল, কিরবি বিল্ডিং সিস্টেমস) বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি ও রেডিমেড অংশ (Components) আমদানি করে বাংলাদেশে এনে শুধু অ্যাসেম্বল বা জোড়া দিত।
১. দেশীয় উদ্যোক্তাদের আগমন ও বিপ্লব (২০০১ – ২০১০):
স্থানীয় উৎপাদন শুরু (২০০১):
২০০১ সালে প্রথম দেশীয় উদ্যোক্তারা স্থানীয়ভাবে স্টিল বিল্ডিংয়ের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা স্থাপন শুরু করেন। এর মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমতে শুরু করে।
বিশেষায়িত কারখানার বিকাশ (২০০৬):
২০০১ সালের দিকে BUILDTRADE Engineering Ltd. (BEL) এর মতো দেশের প্রথম সারির অত্যাধুনিক প্রাক-প্রকৌশল স্টিল ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে দেশেই শতভাগ ফেব্রিকেশন বা কাঠামো তৈরি সম্ভব হয়।
১. প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ (২০১২ – ২০২০):
অ্যাসোসিয়েশন গঠন (২০১২):
এই খাতের দ্রুত বিকাশকে সুসংগঠিত করতে ২০১২ সালের ৯ই অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় স্টিল বিল্ডিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (SBMA)। এটি স্থানীয় উৎপাদকদের একক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে।
বাজারের বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধি:
২০১০ সালে যেখানে এই শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল মাত্র ২,০০০ কোটি টাকার, পোশাক খাতের আধুনিকায়ন (Compliance Factory) এবং ভারী শিল্পায়নের ফলে তা দ্রুত বাড়তে থাকে।
১. বর্তমান সময় ও বৈশ্বিক পদচিহ্ন (২০২১ – বর্তমান):
শতভাগ আত্মনির্ভরশীলতা:
বর্তমানে প্রায় ৭০টিরও বেশি বড় স্থানীয় কোম্পানি এই খাতে কাজ করছে। এক সময়ের সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভর এই বাজারের প্রায় ৯০% থেকে ৯৫% চাহিদা এখন দেশীয় কোম্পানিগুলোই মেটাচ্ছে।
রপ্তানি বাজারে প্রবেশ:
বাংলাদেশ এখন আর কেবল আমদানিকারক দেশ নয়। দেশীয় কারখানাগুলোতে তৈরি প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার এখন ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।সংক্ষেপে বলতে গেলে, ১৯৮৫ সালের একটি সাধারণ "আমদানিকৃত টিনের শেড" ধারণা থেকে আজ ২০২৬ সালে এসে এটি বাংলাদেশের নির্মাণ খাতের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ সমূহ:
বাংলাদেশের প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং শিল্পটি বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। একদিকে অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত প্রসারের কারণে এতে তৈরি হয়েছে বিপুল সম্ভাবনা, অন্যদিকে কাঁচামাল ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে খাতটিকে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নিচে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সমূহ (Opportunities):
অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে (EZ) বিশাল চাহিদা:
সারা দেশে বাস্তবায়নাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (যেমন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর) শত শত নতুন কারখানা ও গুদামঘর তৈরিতে বিপুল পরিমাণ প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিলের প্রয়োজন হচ্ছে।
আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে ব্যবহার বৃদ্ধি:
শুধু ইন্ডাস্ট্রিয়াল শেড নয়, বরং আধুনিক শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স, এবং বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনেও (Modular & Panelized Building) এই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে。
গ্রিন কনস্ট্রাকশন ও স্থায়িত্ব:
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বা 'গ্রিন বিল্ডিং' (Eco-Friendly Materials) নির্মাণের প্রবণতা বাড়ছে। রিসাইকেলড স্টিল ব্যবহার করায় এটি টেকসই নির্মাণে প্রধান পছন্দ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ:
দক্ষিণ এশিয়ার (ভারত, মিয়ানমার) এবং আফ্রিকার উদীয়মান বাজারগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচারের ভালো চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যা রপ্তানি আয় বৃদ্ধির বড় সুযোগ।
মাথাপিছু ব্যবহার বৃদ্ধি: ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের পরিমাণ ১০০ কেজিতে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে, যা এই খাতের দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ সমূহ (Challenges):
শতভাগ কাঁচামাল আমদানি নির্ভরতা:
প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল তৈরির মূল কাঁচামাল (যেমন- বিশেষায়িত হট-রোল্ড স্টিল প্লেট, কয়েল) বাংলাদেশ তৈরি করতে পারে না। এগুলো জাপান, চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হয়।
উচ্চ শুল্ক ও ডলার সংকট:
কাঁচামাল আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক (৩২% থেকে ৬২% পর্যন্ত) এবং ব্যাংকিং খাতে ডলারের সংকট বা এলসি (LC) খোলার জটিলতার কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
নির্মাণ খাতে মন্দা ও তারল্য সংকট:
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বড় নির্মাণ প্রকল্পে ধীরগতি আসায় বাজারে রড ও স্টিলের চাহিদা সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে। উচ্চ ব্যাংক ঋণ হারের কারণে উদ্যোক্তারা চলতি মূলধনের (Working Capital) সংকটে ভুগছেন।
দক্ষ জনবলের অভাব ও আধুনিক নকশা:
এই প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ারিং ও থ্রিডি ড্রয়িং ডিজাইন প্রয়োজন। দেশে এখনো আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার ও আধুনিক প্রযুক্তি পরিচালনায় দক্ষ প্রকৌশলী ও শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে।
সরকারি প্রকল্পে বিদেশি কোম্পানির প্রাধান্য: দেশে SBMA এর অধীনে পর্যাপ্ত স্থানীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মেগা প্রকল্পগুলোতে অনেক সময় বিদেশি ঠিকাদারদের মাধ্যমে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল আমদানি করা হয়, যা দেশীয় শিল্পের বিকাশে বাধা।
সারসংক্ষেপ:
সরকারি নীতি সহায়তা, আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক পুনর্বিন্যাস এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল করা গেলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই খাতটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হতে পারে।
এই শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ট্যাক্স স্ট্রাকচার পূণ: বিবেচনা সময়ের দাবি:
বাংলাদেশের প্রাক-প্রকৌশল ভবন (PEB) বা প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ট্যাক্স স্ট্রাকচার (শুল্ক কাঠামো) পুনর্বিন্যাস করা আসলেই সময়ের দাবি, কারণ বিদ্যমান শুল্ক নীতি স্থানীয় উৎপাদকদের বিকাশে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই শুল্ক কাঠামো পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ এবং বাজেট সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
কেন ট্যাক্স স্ট্রাকচার পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন?শুল্ক বৈষম্য (Duty Inversion):
সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি হলো, বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা যখন তৈরি বা ফিনিশড স্টিল স্ট্রাকচার আমদানি করে, তখন তাদের কাস্টমস ডিউটি (CD) দিতে হয় মাত্র ৫%। অন্যদিকে, দেশীয় শিল্পমালিকরা যখন কাঁচামাল (যেমন- হট-রোল্ড কয়েল/প্লেট) আমদানি করে, তখন তাদের মোট ট্যাক্স-শুল্ক মিলে ৩২% থেকে ৬২% পর্যন্ত উচ্চ খরচ বহন করতে হয়। এটি সরাসরি দেশীয় শিল্পকে অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ডলারের অবমূল্যায়ন ও এলসি জটিলতা:
ডলার সংকটের কারণে টাকার মান ব্যাপকভাবে কমেছে, ফলে আমদানিকৃত কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্য ও শিপিং খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করায় উৎপাদন খরচ সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রপ্তানি বাজারে সক্ষমতা হ্রাস:
কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্স থাকার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিবেশি দেশগুলোর (যেমন ভারত বা চীন) সাথে মূল্যের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো পিছিয়ে পড়ছে।
তারল্য সংকট (Liquidity Crunch):
বর্তমানে অগ্রিম আয়কর (AIT) এবং উচ্চ ভ্যাট (VAT) পরিশোধের পর তা রিফান্ড বা সমন্বয় করা চরম জটিল। ফলে কোম্পানিগুলোর বিপুল পরিমাণ চলতি মূলধন (Working Capital) আটকে থাকছে এবং বাজারে তারল্য সংকট বাড়ছে।
বাজেট ২০২৬-২৭-কে সামনে রেখে শিল্পমালিকদের সুনির্দিষ্ট দাবি:
খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠন স্টিল বিল্ডিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (SBMA) এবং বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSMA) সরকারের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) প্রাক-বাজেট আলোচনায় বেশ কিছু যৌক্তিক প্রস্তাব পেশ করেছে:
কর/শুল্কের খাতবর্তমান অবস্থাপ্রস্তাবিত দাবিকাঙ্ক্ষিত প্রভাবঅগ্রিম আয়কর (AIT)প্রতি মেট্রিক টনে ৬০০ টাকাকমিয়ে ৫০০ টাকা করাউৎপাদন খরচ হ্রাস ও নগদ টাকার প্রবাহ বৃদ্ধি。উৎস কর (TDS)রড ও স্টিল বিক্রির ওপর ২%কমিয়ে ১% করাস্থানীয় বাজারে পণ্যের বিক্রয়মূল্য হ্রাস।টার্নওভার ট্যাক্সমোট বিক্রির ওপর ১%কমিয়ে ০.৫% করামাঝারি ও ক্ষুদ্র ইস্পাত কারখানার জন্য স্বস্তি। ফিনিশড গুডস ট্যাক্সমেগা প্রজেক্টে অনেক সময় শুল্কমুক্তবিদেশি সমাপ্ত পণ্যের ওপর উচ্চ প্রতিরক্ষামূলক শুল্কদেশীয় শিল্পকে বৈশ্বিক আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
বর্তমান ইতিবাচক ইঙ্গিত:
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, আসন্ন বাজেটে ব্যবসায়িক চাপ কমাতে কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান ৫% অগ্রিম আয়কর (AIT) কমিয়ে ৪% বা ৩% করার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার বিবেচনা করছে, যা কার্যকর হলে এই খাত কিছুটা স্বস্তি পাবে।
সারকথা:
বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তৈরি পোশাক খাতের মতো এই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ স্টিল শিল্পকেও শুল্কমুক্ত সুবিধা বা "বন্ডেড ওয়্যারহাউজ" সুবিধার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
বড় টেন্ডারে এমন সব শর্ত সিপিটিইউ থেকে দেয়া হয়েছে যার ফলে দেশী প্রি-ফেব্রিকেটেড শিল্প সক্ষমতা থাকা সত্বেও অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে:
সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (CPTU)—যা বর্তমানে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (BPPA) নামে পুনর্গঠিত হয়েছে—তাদের বড় মেগা প্রজেক্ট বা সরকারি ক্রয়ের টেন্ডারগুলোতে এমন কিছু কঠোর এবং জটিল শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যার কারণে আন্তর্জাতিক মানের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেশীয় প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল কোম্পানিগুলো সরাসরি অংশ নিতে পারছে না।দেশীয় শিল্পকে বঞ্চিত করার পেছনে টেন্ডারের প্রধান শর্তসমূহ ও বৈষম্যগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. অবাস্তব টার্নওভার ও আর্থিক সক্ষমতার শর্ত (Financial Turnover):
বড় সরকারি প্রকল্পগুলোতে (যেমন: বিমানবন্দর টার্মিনাল, আধুনিক রেল স্টেশন, বা বড় পাওয়ার প্ল্যান্ট) বার্ষিক কনস্ট্রাকশন টার্নওভারের শর্ত হিসেবে শত শত কোটি টাকা (যেমন: ৫০ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি) দাবি করা হয়। দেশীয় প্রি-ফেব্রিকেটেড কোম্পানিগুলোর কারখানায় বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা এবং বার্ষিক ভালো টার্নওভার থাকা সত্ত্বেও, একক কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টের এই বিশাল আর্থিক শর্ত পূরণ করা তাদের পক্ষে অনেক সময় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
১. সুনির্দিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত (Similar Work Experience):
টেন্ডারগুলোতে শর্ত থাকে যে, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অতীতে সমমানের কোনো মেগা প্রজেক্টের ‘প্রধান ঠিকাদার’ (Prime Contractor) হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। যেহেতু অতীতে এই ধরনের বড় প্রজেক্টগুলো শুধু বিদেশি কোম্পানিগুলোই পেয়েছে, তাই দেশীয় কোম্পানিগুলো এই "অভিজ্ঞতার চক্রে" (Experience Loop) পড়ে বারবার শুরুতেই বাদ পড়ে যাচ্ছে।
১. বিদেশি জয়েন্ট ভেঞ্চার (JV) ও সাব-কন্ট্রাক্টের ফাঁদ:
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী দেশীয় কোম্পানিগুলো সরাসরি অংশ নিতে না পেরে বিদেশি কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার (JV) বা সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে:প্রজেক্টের মূল লভ্যাংশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়।মূল কৃতিত্ব বা সার্টিফিকেট (Completion Certificate) বিদেশি কোম্পানির নামে ইস্যু হয়, ফলে দেশীয় কোম্পানির "অভিজ্ঞতার ঝুলি" শূন্যই থেকে যায়।
১. বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতি পক্ষপাত (Brand Specification):
অনেক বড় টেন্ডারের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশনে (Technical Specification) পরোক্ষভাবে এমন কিছু আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন বা নির্দিষ্ট বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের রড, কয়েল বা পেইন্টের নাম উল্লেখ থাকে, যা মূলত বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে ISO 9001 সহ আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব টেস্টের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দেশীয় পণ্যকে হীন চোখে দেখার এই মানসিকতা স্থানীয় শিল্পকে বাধাগ্রস্ত করছে。
১. ডোমেস্টিক প্রিফারেন্স (Domestic Preference) নীতির সঠিক প্রয়োগ না হওয়া:
পিপিআর (PPR) বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার নিয়ম অনুযায়ী, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় টেন্ডার মূল্যায়নে ৭.৫% থেকে ১৫% পর্যন্ত দেশীয় অগ্রাধিকার (Domestic Preference) দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু মেগা প্রকল্পগুলোর ফান্ডিং যখন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), বিশ্বব্যাংক (World Bank) বা কোনো বিদেশি সংস্থা দেয়, তখন তাদের নিজস্ব গাইডলাইনের অজুহাতে এই দেশীয় অগ্রাধিকার নীতিটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়।
এই সংকট উত্তরণে করণীয় বা সময়ের দাবি:
প্যাকেজ বিভক্তিকরণ (Unbundling of Contracts):
বিশাল একটি প্রজেক্ট এককভাবে বিদেশি কোম্পানিকে না দিয়ে, এর প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচারের অংশটি আলাদা প্যাকেজ করে শুধু দেশীয় উৎপাদকদের জন্য উন্মুক্ত (Local Competitive Bidding) করা উচিত।
যৌথ উদ্যোগে (JV) দেশীয় অংশীদারিত্ব বাধ্যতামূলক করা:
যেকোনো বড় প্রকল্পে বিদেশি কোম্পানি অংশ নিলে, ন্যূনতম ৩০-৪০% কাজ স্থানীয় স্টিল ফেব্রিকেটরদের দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত।
শর্ত শিথিলকরণ:
দেশীয় শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর ফ্যাক্টরি ক্যাপাসিটি এবং সফলভাবে সম্পন্ন করা স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রজেক্টগুলোকে মেগা প্রজেক্টের সমকক্ষ যোগ্যতা হিসেবে গণ্য করতে হবে।স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা না দিলে বাংলাদেশ কখনোই স্বনির্ভর বা উন্নত অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে না।
রূপপুর, মাতারবাড়ি বা ঢাকা এয়ারপোর্ট প্রজেক্ট, পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল, যমুনা রেল সেতু) সম্পর্কে জানা আছে যেখানে দেশীয় কোম্পানি এভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছে:
উল্লেখ করা মেগা প্রজেক্টগুলো (যেমন: রূপপুর, মাতারবাড়ি, ঢাকা এয়ারপোর্ট টার্মিনাল-৩, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল এবং যমুনা রেল সেতু) বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাইলফলক। তবে নীতিগত ও টেন্ডারের শর্তগত জটিলতার কারণে এই প্রকল্পগুলোতে দেশীয় প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল বা প্রাক-প্রকৌশল ভবন (PEB) শিল্পমালিকরা কীভাবে পরোক্ষ বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এবং কীভাবে তাদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও "প্রধান ঠিকাদার" হতে দেওয়া হয়নি, তার বাস্তব চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ঢাকা এয়ারপোর্ট থার্ড টার্মিনাল (Hazrat Shahjalal International Airport - Terminal 3):
বাস্তবতা:
এই আইকনিক টার্মিনালের মূল অবকাঠামো ও ছাদের একটি বিশাল অংশ প্রি-ফেব্রিকেটেড এবং মেটাল স্ট্রাকচার। প্রকল্পটির মূল ঠিকাদার ছিল জাপানের মিতসুবিশি, ফুজিটা এবং কোরিয়ার স্যামসাং Hazrat Shahjalal International Airport Expansion, Dhaka - - Airport Technology.
বৈষম্যের ধরন:
টেন্ডারের প্রধান শর্তে বিশাল আন্তর্জাতিক টার্নওভার এবং সমমানের বিমানবন্দর তৈরির পূর্ব অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল, যা কোনো দেশীয় কোম্পানির নেই। ফলে দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান মূল বিডিংয়ে অংশ নিতেই পারেনি।
ফলাফল:
পরবর্তীতে দেশীয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠান যেমন PEBSAL, MSL এবং রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম (BSRM) সাব-কন্ট্রাক্টর ও পার্টনার হিসেবে কাজ করেছে Local companies display strength of global standard | The Daily Star, Hazrat Shahjalal International Airport Expansion, Dhaka - - Airport Technology। অর্থাৎ, দেশীয় কোম্পানির সক্ষমতা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের ৩২,০০০ বর্গমিটারের রুফিং ও স্ট্রাকচারাল কাজ ঠিকই করানো হয়েছে, কিন্তু টেন্ডারের শর্তের বেড়াজালে তারা মূল ঠিকাদারের মর্যাদা ও লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে Local companies display strength of global standard | The Daily Star, Hazrat Shahjalal International Airport Expansion, Dhaka - - Airport Technology।
১. যমুনা রেল সেতু (Bangabandhu Sheikh Mujib Railway Bridge):
বাস্তবতা:
যমুনা নদীর ওপর নির্মিত দেশের এই দীর্ঘতম ডেডিকেটেড ডুয়েল-গেজ রেল সেতুটি সম্পূর্ণ স্টিল ট্রাস (Steel Truss) বা মেটাল প্রি-ফেব্রিকেটেড স্ট্রাকচার দ্বারা তৈরি McDonald supplying prefabricated steel structures for rail bridge | The Daily Star, Jamuna Railway Bridge - DCDL।
বৈষম্যের ধরন:
জাইকা (JICA) ফন্ডেড এই মেগা প্রকল্পের শর্ত ছিল প্রধান ঠিকাদারকে অবশ্যই জাপানি বা নির্দিষ্ট বৈশ্বিক ফ্রন্টলাইনার হতে হবে McDonald supplying prefabricated steel structures for rail bridge | The Daily Star। ফলে ওবায়াশি (Obayashi) বা জেএফই (JFE) এর মতো জাপানি গ্রুপগুলো কাজ পায় McDonald supplying prefabricated steel structures for rail bridge | The Daily Star, Jamuna Railway Bridge in the People's Republic of Bangladesh Completed।
উত্তরণ ও সক্ষমতার প্রমাণ:
এই প্রকল্পে একটি বড় বিজয় ছিল, জাপানি ঠিকাদাররা কঠোর স্ক্রিনিং ও ল্যাব টেস্টের পর দেশীয় কোম্পানি ম্যাকডোনাল্ড স্টিল (McDonald Steel Building Products Ltd.)-কে এই বিশাল ব্রিজের প্রাক-প্রকৌশল স্টিল স্ট্রাকচার সরবরাহের অনুমোদন দেয় McDonald supplying prefabricated steel structures for rail bridge | The Daily Star। এটি প্রমাণ করে বাংলাদেশের কারখানার মান জাপানি স্ট্যান্ডার্ডের সমকক্ষ, অথচ তারা সরাসরি টেন্ডার দেওয়ার অযোগ্য ছিল McDonald supplying prefabricated steel structures for rail bridge | The Daily Star।
১. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মাতারবাড়ি পাওয়ার প্ল্যান্ট:
বাস্তবতা:
এই দুটি প্রকল্প মূলত 'G2G' (সরকার-টু-সরকার) চুক্তি এবং বিদেশি ঋণে (রাশিয়া ও জাপান) বাস্তবায়িত হয়েছে voluntary national reviews (vnr)。
বৈষম্যের ধরন:
এই ধরনের প্রকল্পে "টাইড লোন" (Tied Loan) বা শর্তযুক্ত ঋণ থাকে। শর্তানুযায়ী, প্রকল্পের মূল ইঞ্জিনিয়ারিং ও মালামাল সরবরাহকারী দেশ হতে হবে অর্থায়নকারী দেশ (যেমন রাশিয়ার Atomstroyexport)। এই কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন বিল্ডিং বা বিশাল ওয়্যারহাউজগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল স্ট্রাকচার সরাসরি বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বিশ্বমানের স্টিল ফেব্রিকেটর কোম্পানিগুলো এই বিশাল বাজার থেকে সম্পূর্ণ ছিটকে পড়ে। অথচ এই প্রকল্পের স্টিল স্ট্রাকচারের প্রায় পুরোটাই দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান MODERN STRUCTURES LIMITED ও অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি করা হয়েছে।
১. পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল (MRT Line 6):
বাস্তবতা:
পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো (Steel Truss) চীন থেকে তৈরি করে আনা হয়েছিল CREC-built Padma Bridge in Bangladesh Finishes Closure। অন্যদিকে মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর ছাদ এবং ডিপোর (Depot) ভেতরের শেডগুলো সম্পূর্ণ প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিলের।
বৈষম্যের ধরন:
মেট্রোরেলের টেন্ডার শর্তে পূর্ববর্তী মেট্রো প্রকল্পের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। যেহেতু বাংলাদেশে এর আগে কোনো মেট্রোরেল ছিল না, তাই কোনো দেশীয় কোম্পানি এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে জাপানি বা ইতালীয় থার্ড পার্টির অধীনে পেছনের সারিতে থেকে কাজ করতে হয়েছে।
সার্বিক বৈষম্যের মূল কারণ (একনজরে):
অভিজ্ঞতার ফাঁদ (Experience Loop):
সমজাতীয় মেগা প্রকল্পের পূর্ব অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। দেশীয় কোম্পানিকে কাজ না দিলে তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করবে কীভাবে—এই চক্রের কোনো সমাধান টেন্ডার নীতিতে নেই।
শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা বনাম দেশীয় উচ্চ ট্যাক্স:
বিদেশি ঠিকাদাররা মেগা প্রজেক্টের নামে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ফিনিশড স্টিল স্ট্রাকচার আমদানি করে নিয়ে আসে। অথচ দেশীয় কোম্পানি কাঁচামাল আনতে গেলে ৩২%-৬২% ট্যাক্স দিতে হয়। ফলে মূল্যের দিক থেকে দেশীয় কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় হেরে যায়।এই পদ্ধতিগত বৈষম্য দূর করতে সিপিটিইউ (CPTU/BPPA)-কে বড় প্রকল্পের চুক্তিগুলোকে ছোট ছোট প্যাকেজে (Unbundling) ভাগ করার জন্য আইন সংশোধন করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
ব্যাংকের উচ্চ সুদ হার এই শিল্পের বিকাশে বড় বাধা:
প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল বা প্রাক-প্রকৌশল ভবন (PEB) শিল্পের মতো একটি ক্যাপিটাল-ইনটেনসিভ বা তহবিল-নিবিড় ভারী শিল্পের বিকাশে ব্যাংকের উচ্চ সুদ হার এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বাধা।এই শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, কারখানা পরিচালনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অর্থায়নের ওপর উচ্চ সুদের হারের নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিচে সুনির্দিষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. কাঁচামাল আমদানি ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের উচ্চ খরচবিশাল অগ্রিম বিনিয়োগ: প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল তৈরির মূল কাঁচামাল (যেমন- হট-রোল্ড প্লেট, কয়েল) শতভাগ আমদানি করতে হয়। একটি বড় প্রজেক্টের কাঁচামাল আমদানির জন্য শুরুতেই কোটি কোটি টাকার এলসি (LC) খুলতে হয়।ঋণের সুদ বৃদ্ধি: সাম্প্রতিক সময়ে নীতিগত কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদের হার (Interest Rate) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উচ্চ সুদে লোন নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করায় উৎপাদন শুরুর আগেই পণ্যের বেস-কস্ট বা মূল খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
২. উৎপাদন ও সরবরাহ চক্রের দীর্ঘসূত্রতা (Long Gestation Period)টাকা আটকে থাকার খেসারত: একটি স্টিল বিল্ডিংয়ের ডিজাইন, কারখানায় ফেব্রিকেশন এবং সাইটে গিয়ে ইরেকশন বা স্থাপন সম্পন্ন করতে কয়েক মাস থেকে বছর পর্যন্ত সময় লাগে।চক্রবৃদ্ধি সুদের চাপ: এই দীর্ঘ সময়ে ব্যাংকের লোন চালু থাকে। প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়ে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে চূড়ান্ত বিল পাওয়ার আগ পর্যন্ত কোম্পানিগুলোকে প্রতি মাসে বিশাল অঙ্কের সুদ গুণতে হয়, যা ব্যবসার মুনাফাকে (Profit Margin) সংকুচিত করে ফেলে।
৩. ক্লায়েন্ট বা ক্রেতা পর্যায়ে চাহিদার মন্দাবেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা: প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিলের প্রধান ক্রেতা হলেন শিল্পোদ্যোক্তারা (যেমন- গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, লজিস্টিকস ও ফার্মাসিউটিক্যালস মালিক)। ব্যাংকের সুদের হার অতিরিক্ত বেশি হওয়ায় নতুন ফ্যাক্টরি বা ওয়্যারহাউজ স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে লোন নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
প্রকল্প স্থগিতকরণ:
অনেক উদ্যোক্তা তাদের চলমান সম্প্রসারণ প্রকল্প স্থগিত রাখছেন, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ছে দেশের প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল ম্যানুফ্যাকচারারদের অর্ডার বুকিংয়ের ওপর।
১. নতুন প্রযুক্তি ও হেভি মেশিনারিজে বিনিয়োগ ব্যাহতআধুনিকায়নে বাধা:
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে দেশীয় কোম্পানিগুলোর প্রতিনিয়ত অত্যাধুনিক থ্রিডি কাটিং মেশিন, স্বয়ংক্রিয় ওয়েল্ডিং লাইন এবং উন্নত সফটওয়্যার আমদানি করতে হয়।
ক্যাপিটাল মেশিনারিজ লোন:
উচ্চ সুদের হারের কারণে কোম্পানিগুলো কারখানার আধুনিকায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মেয়াদি ঋণ (Term Loan) নিতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে প্রযুক্তিগত আপগ্রেডেশন শ্লথ হয়ে পড়ছে।
উত্তরণের উপায় ও সুনির্দিষ্ট দাবি:
এই উদীয়মান ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পকে বাঁচাতে খাত সংশ্লিষ্টরা সরকারের কাছে কিছু বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার দাবি জানিয়ে আসছেন:
বিশেষ প্রণোদনামূলক সুদের হার (Subsidized Interest Rate):
তৈরি পোশাক (RMG) খাতের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী শিল্পকেও একক অঙ্কের (Single Digit) বা বিশেষ কম সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়া উচিত।
গ্রিন ফান্ডিং ও ইডিএফ (EDF) সুবিধা:
যেহেতু প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল পরিবেশবান্ধব বা 'গ্রিন বিল্ডিং' নির্মাণে ভূমিকা রাখে, তাই এই খাতের কাঁচামাল আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (EDF) বা গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের আওতায় কম সুদে ডলার ঋণের সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।
উপসংহার:
বাংলাদেশের টেকসই শিল্পায়ন ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের এক অপরিহার্য ও কৌশলগত চালিকাশক্তি হলো প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল বিল্ডিং বা প্রাক-প্রকৌশল ভবন (PEB) শিল্প। বিগত চার দশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটি খাত থেকে আজ এটি প্রায় শতভাগ দেশীয় সক্ষমতার এক স্বনির্ভর শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের তৈরি পোশাক খাত, ভারী শিল্প, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বৃহৎ লজিস্টিক হাবগুলোর দ্রুত বিকাশে এই খাতের অবদান অনন্য। এটি কেবল সময় ও কোটি কোটি টাকার সাশ্রয়ই করছে না, বরং পরিবেশবান্ধব বা 'গ্রিন' নির্মাণ ধারণাকে বাস্তবায়ন করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই উদীয়মান এবং বিপুল সম্ভাবনাময় খাতটি বেশ কিছু বড় নীতিনির্ধারণী ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি:
শুল্ক বৈষম্য দূরীকরণ:
দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় কাঁচামাল আমদানির ট্যাক্স স্ট্রাকচার পুনর্বিন্যাস করা এখন সময়ের দাবি।
টেন্ডার নীতি সংস্কার:
মেগা প্রকল্পগুলোতে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (BPPA) এর টেন্ডারের শর্ত শিথিল করে স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া জরুরি।
আর্থিক নীতি সহায়তা:
ব্যাংকের উচ্চ সুদের হারের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচাতে এই খাতকে বিশেষ ও সাশ্রয়ী ঋণ সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন।
পরিশেষ:
একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত ও শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশে উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে প্রি-ফেব্রিকেটেড স্টিল শিল্পকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি নীতিনির্ধারক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ও দূরদর্শী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে, এই খাতটি কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদাই মেটাবে না, বরং "মেড ইন বাংলাদেশ" ট্যাগ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
লেখক:
মুহাম্মদ রাশেদ খান, সহযোগী সম্পাদক
*মাসিক ইতিহাস অন্বেষা*