
মানবতা এখনো বেঁচে আছে
কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত।ভোরবেলা। চারদিকে শুধু ঢেউয়ের শব্দ আর ঠান্ডা বাতাস। প্রতিদিনের মতো সেই ভোরেও মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দরিদ্র জেলে কামাল মিয়া। ছোট্ট একটি টিনের ঘর, সংসারে তেমন কেউ নেই। স্ত্রী কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। একমাত্র ছেলেও বিদেশে চলে যাওয়ার পর কামাল মিয়া একাই জীবন কাটাচ্ছিলেন।
সেদিনও তিনি তার পুরনো নৌকাটি ঠেলে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তার চোখ পড়ে সৈকতের একপাশে। দূরে পানির ধারে কেউ একজন পড়ে আছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো কোনো পর্যটক ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু কাছে যেতেই বুকটা কেঁপে উঠলো।
একজন তরুণী অচেতন অবস্থায় বালুর উপর পড়ে আছে। চুল এলোমেলো, শরীর কাঁপছে, মুখ ফ্যাকাশে। আশেপাশে কোনো মানুষ নেই।
কামাল মিয়া ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি কয়েকবার ডাকলেন—
“মা… শুনতে পাচ্ছো? ওঠো মা…”
কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
তিনি দৌড়ে সমুদ্র থেকে পানি এনে মেয়েটির মুখে ছিটালেন। তবুও জ্ঞান ফিরলো না। চারদিকে তাকিয়ে কাউকে না পেয়ে তিনি এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। নিজের মেয়ের মতো করে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিলেন।
সেদিন আর মাছ ধরতে যাওয়া হলো না তার।
তিনি মেয়েটিকে নিজের ছোট্ট বাড়িতে নিয়ে এলেন। পুরনো বিছানায় শুইয়ে দিলেন। মাথায় পানি দিলেন। দোকান থেকে ওষুধ এনে খাওয়ালেন। নিজের কষ্টের টাকা দিয়ে নতুন জামাকাপড় কিনে আনলেন। মেয়েটির জ্বর এত বেশি ছিল যে শরীর কাঁপছিল।
রাতভর তিনি ঘুমাননি।
মাঝে মাঝে মেয়েটির মাথায় ভেজা কাপড় রাখছিলেন আর বলছিলেন—
“আল্লাহ, এই মেয়েটাকে বাঁচাইয়া দেন।”
পরদিন বিকেলে মেয়েটির জ্ঞান ফিরলো। চোখ খুলেই সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো—
“আমার আইফোন কোথায়? আমার মোবাইল?”
কামাল মিয়া মৃদু হেসে বললেন—
“মা, আল্লাহ তোমারে বাঁচাইছে, এটাই তো সবচেয়ে বড় কথা।”
মেয়েটি উঠে বসার চেষ্টা করলো কিন্তু পুরো শরীর ব্যথায় কাঁপছিল। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিল না। কামাল মিয়া নাম জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু মেয়েটি কিছুই মনে করতে পারলো না।
দিন কেটে যেতে লাগলো।
কামাল মিয়া নিজের হাতে রান্না করে তাকে খাওয়াতেন। ওষুধ দিতেন। কখনো মাথায় তেল দিতেন, কখনো জ্বর মাপতেন। এলাকায় কেউ কেউ খারাপ কথা বলতো—
“এত ঝামেলা ঘরে আনছেন কেন?”
কিন্তু কামাল মিয়া শুধু একটা কথাই বলতেন—
“মানুষ বিপদে পড়লে মানুষই তো পাশে দাঁড়াবে।”
প্রায় এক সপ্তাহ পর মেয়েটি একটু সুস্থ হলো। একদিন বিকেলে সমুদ্রের বাতাস জানালা দিয়ে আসছিল। মেয়েটি ধীরে ধীরে বললো—
“চাচা… আমার নাম সামিয়া।”
কামাল মিয়া খুশি হয়ে বললেন—
“আলহামদুলিল্লাহ! মা, তোমার বাড়ি কোথায়?”
সামিয়ার চোখে পানি চলে এলো।
সে বললো—
“আমি গাজীপুরে থাকি। পরিবারের চাপে কক্সবাজারে একটা হোটেলে চাকরি নিয়েছিলাম। কিন্তু কয়েকদিন আগে চাকরিটা চলে যায়। টাকার চিন্তা, পরিবারের ভয়… সব মিলিয়ে আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম। সেদিন না খেয়ে সমুদ্রের পাশে হাঁটছিলাম। হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাই। তারপর আর কিছু মনে নেই।”
কামাল মিয়া চুপচাপ শুনছিলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
“জীবনে যত কষ্টই আসুক মা, জীবন শেষ করার মতো কিছু না। মানুষ বাঁচলে আবার সব শুরু করতে পারে।”
সামিয়া কান্না করে ফেললো।
“চাচা, আপনি না থাকলে আমি হয়তো আজ বাঁচতাম না।”
কয়েকদিন পরে কামাল মিয়া সামিয়ার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করলেন। সামিয়ার বাবা-মা খবর পেয়ে কক্সবাজারে ছুটে আসলেন। মেয়েকে সুস্থ দেখে তারা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
সামিয়ার বাবা কামাল মিয়ার হাত ধরে বললেন—
“আপনি আমাদের মেয়েকে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমরা এই ঋণ কখনো শোধ করতে পারবো না।”
কামাল মিয়া শুধু হাসলেন।
“আমি যা করছি, একজন মানুষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।”
তারপর তিনি নিজে সামিয়াকে গাজীপুরে পৌঁছে দিলেন। সামিয়ার পরিবার তাকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো সম্মান করলো। কিছুদিন তাদের বাসায় থেকে বেড়ালেন কামাল মিয়া। ধীরে ধীরে দুই পরিবারের মধ্যে খুব সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হলো।
সামিয়া আবার নতুন করে জীবন শুরু করলো। পরে সে অসহায় মানুষদের সাহায্য করার জন্য একটি ছোট সংগঠনও গড়ে তোলে। কারণ সে বুঝেছিল—
একজন ভালো মানুষের ছোট্ট সাহায্যও কারো পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
শিক্ষণীয় বিষয়
বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করা মানবতার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
মানুষের জীবন টাকা বা মোবাইলের চেয়ে অনেক মূল্যবান।
কষ্ট যত বড়ই হোক, হতাশ হয়ে জীবন থেকে হেরে যাওয়া উচিত নয়।
সমাজের খারাপ কথার ভয়ে ভালো কাজ থামিয়ে দেওয়া ঠিক না।
একজন ভালো মানুষ পুরো পৃথিবীকে সুন্দর করে তুলতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : একরামুল হক বেলাল
ঢাকা অফিস-২২,মা ভিলা ,পূর্ব তেজতুরী বাজার,ফার্মগেট-১২১৫,
ইমেইল-spnews17@gmail.com
রেলওয়ে পার্ক,পার্বতীপুর,দিনাজপুর। ০১৭১২৩৭০৮০০
© 2026 Songbad Protikkhon-Spnewsbd. All rights reserved.