
রাশিয়ায় ডাক্তারি পড়তে গিয়ে বিদেশিনিকে প্রেগন্যান্ট করল ইমাম সাহেবের ছেলে! ধর্মের দোহাই দিয়ে কি গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেশে পালাবে তরিকুল?
মস্কোর হাড়কাঁপানো শীতে যখন তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রিতে নামে, তখন কেবল শরীর নয়, আত্মাও যেন জমে যায়। তরিকুলের জীবনটাও এমনই জমে ছিল। গ্রামের এক ধর্মপ্রাণ ইমাম সাহেবের ছেলে তরিকুল। বাবার সারাজীবনের জমানো টাকা আর গ্রামের মানুষের দোয়ায় সে রাশিয়ায় এসেছিল ডাক্তারি পড়তে। কিন্তু এই ভিনদেশের যান্ত্রিক জীবনে তার একাকীত্ব কাটানোর কেউ ছিল না। এই শূন্যতা থেকেই তার পরিচয় হয় ভার্সিটির পাশের এক ক্যাফে কর্মী আনিয়া-র সাথে।
আনিয়া দেখতে যেমন সুন্দর, তার মনটাও ছিল বরফের মতো স্বচ্ছ। ভাষার কিছুটা অমিল থাকলেও অনুভূতির কোনো ভাষা লাগে না। তরিকুল যখন জ্বরে ভুগত, আনিয়া তার জন্য স্যুপ বানিয়ে আনত। এই একাকীত্ব আর পশ্চিমা খোলামেলা কালচারের প্রভাবে তারা খুব দ্রুতই একে অপরের কাছে চলে আসে। ধর্মীয় অনুশাসন আর বাবার কড়া চেহারার কথা ভুলে গিয়ে তরিকুল একসময় আনিয়া-র সাথে লিভ-ইন শুরু করে এবং শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত। মাস তিনেক পর আনিয়া একদিন তরিকুলকে জানায়, সে প্রেগন্যান্ট। কথাটা শোনার সাথে সাথে তরিকুলের পায়ের নিচ থেকে যেন মস্কোর মাটি সরে গেল। তার মনে পড়ে গেল গ্রামের সেই মসজিদের কথা, যেখানে তার বাবা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ান। সমাজ যদি জানতে পারে ইমাম সাহেবের ছেলে বিয়ের আগে এক ভিনদেশি বিধর্মী মেয়েকে প্রেগন্যান্ট করেছে, তবে তার বাবা স্ট্রোক করে মারা যাবেন। লজ্জায় পুরো গ্রামের সামনে তাদের মাথা কাটা যাবে।
তরিকুলের ভেতরে শুরু হলো চরম ‘ইনার কনফ্লিক্ট’ বা মানসিক দ্বন্দ্ব। একদিকে তার দীর্ঘদিনের লালিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও বাবার সম্মান, অন্যদিকে তার নিজেরই ঔরসজাত সন্তান আর আনিয়া। ভয়ে আর আতঙ্কে তরিকুল সবচেয়ে কাপুরুষোচিত সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল। সে আনিয়াকে বলল, “এই বাচ্চা আমরা রাখতে পারব না। আমার পরিবার, আমার সমাজ আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে। তুমি অ্যাবরশন করে নাও, আমি সব খরচ দিচ্ছি।”
কথাটা শুনে আনিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। যে ছেলেটা তাকে ভালোবাসার কথা বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জড়িয়ে ধরে থাকত, সে আজ কেবল নিজের সম্মান বাঁচাতে একটা ভ্রূণকে হত্যা করতে চাইছে? আনিয়া সেদিন তরিকুলের চোখে চোখ রেখে বলেছিল, “তরিকুল, তোমাদের ধর্মে কি নিজের রক্তকে অস্বীকার করে পালিয়ে যাওয়াকে পুণ্য বলে? তুমি যদি কাপুরুষ হতে চাও, তুমি দেশে ফিরে যাও। কিন্তু এই বাচ্চা আমি নষ্ট করব না, ও আমার শরীরের অংশ।”
আনিয়ার এই একটা কথা তরিকুলের বিবেককে চাবুকের মতো আঘাত করল। সে সারা রাত মস্কোর বরফ ঢাকা রাস্তায় একা একা হাঁটল আর কাঁদল। সে বুঝতে পারল, ভুল সে করেছে, আনিয়া নয়। এখন ধর্মের দোহাই দিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা কোনো সমাধান নয়, বরং সেটা হবে সবচেয়ে বড় পাপ। সে পরদিন সকালে আনিয়ার কাছে ফিরে গিয়ে তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
তরিকুল সিদ্ধান্ত নিল, সে পালাবে না। সে বাবার পাঠানো টাকা নেওয়া বন্ধ করে দিল। শুরু হলো তার এক অমানুষিক লড়াই। দিনের বেলা মেডিকেলের ক্লাস, আর রাতে মস্কোর রাস্তায় ফুড ডেলিভারি ও রেস্টুরেন্ট ক্লিনিংয়ের কাজ। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সে আনিয়াকে রাশিয়ান সিভিল রেজিস্ট্রিতে বিয়ে করল। তার বাবা-মা কিছুই জানত না। তরিকুল তার এই সংগ্রাম আর অভাবের কথা কাউকে বুঝতে দেয়নি। আনিয়াও তরিকুলকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য প্রেগন্যান্ট অবস্থাতেই কাজ চালিয়ে গেল। তাদের এই লড়াই ছিল এক পাপবোধ থেকে পবিত্রতায় ফিরে আসার লড়াই।
এভাবেই কেটে যায় পাঁচ বছর। তরিকুল আজ একজন সফল ডাক্তার। সে দেশে ফিরেছে। কিন্তু একা নয়, সাথে তার স্ত্রী আনিয়া এবং তাদের তিন বছরের ফুটফুটে ছেলে 'আয়ান'।
গ্রামের বাড়িতে যখন তরিকুল তার রাশিয়ান স্ত্রী আর সন্তান নিয়ে পা রাখল, পুরো গ্রাম যেন ভেঙে পড়ল। তরিকুলের বাবা, সেই কড়া ইমাম সাহেব, অপমানে আর রাগে কাঁপছিলেন। “তুই আমার মুখে চুনকালি দিয়েছিস! ভিনদেশি মেয়েছেলে আর এই অবৈধ বাচ্চা নিয়ে তুই আমার বাড়িতে ঢুকেছিস? বেরিয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে!” বাবা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তরিকুলের মা তখন আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছেন।
তরিকুল বাবার পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বলল, “আব্বা, আমি বিদেশে গিয়ে একাকীত্বে একটা ভুল করেছিলাম। কিন্তু আমি কাপুরুষের মতো সেই ভুলের বলি এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে বানাইনি। আমি পালিয়ে আসিনি আব্বা! আমি দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ওর দায়িত্ব নিয়েছি, ওকে আইনিভাবে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছি। আমার এই কাজটা কি আপনার ওই তথাকথিত সমাজের চোখের চেয়েও খুব বেশি খারাপ হয়েছে?”
ঠিক সেই মুহূর্তে তিন বছরের ছোট্ট আয়ান টলটলে পায়ে হেঁটে গিয়ে ইমাম সাহেবের পাঞ্জাবির কোণা ধরে টান দিল। আধো আধো বাংলায় বলল, “দাদা... কোলে।”
ইমাম সাহেব চমকে নিচে তাকালেন। ছেলেটার চোখগুলো অবিকল তরিকুলের মতো। সেই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে একজন কঠোর ধর্মীয় নেতার সব রাগ, সব অভিমান মুহূর্তের মধ্যে গলে জল হয়ে গেল। তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। বসে পড়ে ছোট্ট আয়ানকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আনিয়া তখন শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মুছছে।
গ্রামের মানুষ যারা একটু আগে কানাঘুষা করছিল, তারা স্তব্ধ হয়ে গেল। তরিকুল প্রমাণ করে দিল, মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। কিন্তু সেই ভুলের জন্য সমাজ বা ধর্মের দোহাই দিয়ে কাউকে পথে বসিয়ে দেওয়া পুরুষত্ব নয়। আসল পুরুষত্ব হলো নিজের ভুলের দায়ভার নেওয়া এবং চরম প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে বুক আগলে রক্ষা করা।
🌸 গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন! এমন বাস্তব, হৃদয়ছোঁয়া ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প নিয়মিত পেতে আমাদের পেজটি ফলো দিয়ে পাশে থাকুন। ⭐ আপনার একটি স্টার আমাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।
সংগৃহিতহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : একরামুল হক বেলাল
ঢাকা অফিস-২২,মা ভিলা ,পূর্ব তেজতুরী বাজার,ফার্মগেট-১২১৫,
ইমেইল-spnews17@gmail.com
রেলওয়ে পার্ক,পার্বতীপুর,দিনাজপুর। ০১৭১২৩৭০৮০০
© 2026 Songbad Protikkhon-Spnewsbd. All rights reserved.