
।। এবিএম ফজলুর রহমান।।
আজ থেকে শত বছর আগে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহুকুমার কাশিয়ানি থানার প্রত্যন্ত গ্রাম আড়ুয়াকান্দিতে এক ক্ষণজন্মা পুরুষের জন্ম হয়েছিল, যিনি তার স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির মধ্য দিয়ে শুন্য থেকে শিঁখড়ে পৌছেছিলেন ; যুদ্ধ বিধস্ত অনুন্নত একটি জনসংখ্যা বহুল দেশে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য। করেছিলেন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান। দেশের বেসরকারি খাতকে পৌছে দিয়েছিলেন অনন্য উচু স্থানে। তাঁর জীবন ছিল স্বপ্ন দেখার গল্প, সেই স্বপ্নকে সাহসে ধারণ করার গল্প। আর সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভেঙে তৈরি করেছিলেন একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্মাণের গল্প। তিনি হলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

এটি কেবল একটি নাম নয়, এটি সাহস, সততা এবং মানবসেবার এক জীবন্ত উপাখ্যান। আজ তাঁর ১০১ তম জন্মদিনে ফিরে তাকালে মনে হয় একজন মানুষ চলে গেলেও তাঁর কর্মের আলো কখনো নিভে যায় না। সময় তাঁকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে, কিন্তু তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান, তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবোধ এবং তাঁর উদ্যোক্তা-চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে। একটি ছোট স্বপ্নের মহীরুহ হয়ে ওঠা।
একদিন ছিল ছোট্ট এক উদ্যোগ। ছিল সীমিত সামর্থ্য, ছিল অনিশ্চয়তা, ছিল পথের অসংখ্য বাধা। কিন্তু ছিল একটি বড় স্বপ্ন বাংলাদেশের মাটিতে বিশ্বমানের শিল্প গড়ে তোলা। সেই স্বপ্নের পথিকৃৎ ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী।
শৈশবে তার স্বপ্ন ছিল বাবার মতো একজন ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু সংসারের আর্থিক টানাপোড়েন এবং অনুজ চার ভাই ও দুই বোনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি সেই স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে যোগ দেন রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে। তবে, এখানেই তার দৃঢ় মানসিকতার প্রথম পরিচয় মেলে। তিনি প্রচলিত সিগনালিং শাখায় যোগ না দিয়ে রাডার অপারেটর হওয়ার জন্য চার দিন জেল খাটেন। তার অটল ইচ্ছার কাছে নেভি কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয়। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে পাবনার ডাক বিভাগে চাকরি করলেও তার উদ্যোক্তা মন সেখানে থিতু হতে পারেনি।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী স্যামসন এইচ চৌধুরী ১৯২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার কাশীয়ানী থানার আড়ুয়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্যামসন চৌধুরী ভারতে পড়াশুনা শেষ করে ১৯৫২ সালে পাবনা জেলার আতাইকুলায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর বাবা ইয়াকুব হোসেন চৌধুরী একটি চিকিৎসা কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার ছিলেন।
১৯৫৬ সালে বাবার পরামর্শে তিনি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের বাড়িতেই একটি ছোট ওষুধের কারখানা শুরু করেন। নাম দিলেন ‘ইসনস্’ (ঊংড়হং)। তার একমাত্র সহযোগী ছিলেন স্ত্রী অনিতা চৌধুরী। এই ছোট্ট কারখানাটি ছিল তার স্বপ্নের এক ক্ষুদ্র বীজ বপন। ১৯৫৮ সালে তিনি আরও তিন বন্ধুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্কয়ার’। এই নামের পেছনে ছিল গভীর এক দর্শন: স্কয়ারের চারটি বাহু যেমন চার বন্ধুকে বোঝাতো, তেমনি এটি ছিল পরিপূর্ণতা ও শুদ্ধতার প্রতীক। তার বিখ্যাত উক্তি, ‘সাফল্য অর্জনে কোনো শর্টকাট পথ নেই’, এই মন্ত্রকে তিনি সবসময় পাথেয় করেছেন। প্রথম তিন বছর কোনো লাভ না হলেও তার অবিচল সাধনা স্কয়ারকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যায়। ১৯৮৫ সালে এটি দেশের সব বহুজাতিক কোম্পানিকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করে নেয় এবং সেই অবস্থান আজও ধরে রেখেছে। দেশের সীমা ছাড়িয়ে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস-এর ওষুধ ছাড়াও স্কয়ারের অন্যান্য পণ্য আজও বাজারজাত করা হচ্ছে দেশের বাইরে।
ঔষধশিল্পে সাফল্যের পর তিনি তার প্রতিষ্ঠানকে আরও প্রসারিত করেন। ১৯৮৮ সালে স্কয়ার টয়লেট্রিজ, ১৯৯৪ সালে স্কয়ার টেক্সটাইলস, ১৯৯৭ সালে মিডিয়াকম লিমিটেড, ১৯৯৮ সালে এগ্রো-কেমিক্যালস ও ভেটেরিনারি প্রোডাক্টস, ২০০০ সালে স্কয়ার স্পিনিং এবং ২০০১ সালে স্কয়ার নিট ফ্যাব্রিক্স, স্কয়ার ফ্যাশনস, স্কয়ার কনজিউমার প্রোডাক্টস, স্কয়ার ইনফরম্যাটিক্স ও স্কয়ার হসপিটালস লিমিটেড এবং ২০১১ সালে মাছরাঙা টেলিভিশনের যাত্রা শুরু করে। এভাবে একের পর এক নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি দেশের শিল্পখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
একজন সফল শিল্পপতি হয়েও তিনি তার মানবিক মূল্যবোধ থেকে কখনোই দূরে সরে যাননি। সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে তিনি মুক্তহস্তে দান করতেন। মানুষের সেবা করাকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার পাশাপাশি নিভৃতে সমাজসেবা করেছেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। তিনি ও তাঁর প্রয়াত স্ত্রী অনিতা চৌধুরীর প্রচেষ্টায় পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেবির প্রথম তলায় গড়ে উঠে ‘দিশারী কম্পিউটার টেনিং সেন্টার’। অনিতা-স্যামসন ফাউন্ডেশন পরিচালিত বিনামূল্যের এই কেন্দ্রে প্রতি ৬ মাসে ১৮ জন ছেলে ও ১৩ জন মেয়ে প্রশিক্ষণ পান। এ পর্যন্ত সহ্রসাধিক দরিদ্র ঘরের ছেলে মেয়ে স্কয়ারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
পাঠকদের সুবিধার্থে পাবনার ২‘শ বছরের পুরোনো অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরীর চারতলা নতুন ভবন নির্মাণ করেন। পাবনার বনমালি শিল্পকলা কেন্দ্র আধুনিকায়ন ও পাবনা প্রেসক্লাবের ভিআইপি হল রুম তৈরি করে দেন। মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি অনন্য ভুমিকা রাখেন।
স্যামসন এইচ চৌধুরীর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তার ভিশন ও আদর্শগুলো তার উত্তরসূরিদের মধ্যে প্রবাহিত করতে পারা। তার চার সন্তানের সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে স্যামুয়েল এস চৌধুরী স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান, মেয়ে রত্না পাত্র স্কয়ার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান, মেঝ ছেলে তপন চৌধুরী স্কয়ার ফার্মাসিটিউক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ছোট ছেলে অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু মাছরাঙা টেলিভিশন স্কয়ার ট্রয়লেট্রিজ এবং স্কয়ার ফুড এন্ড বেভারেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
সন্তানদের নেতৃত্বে স্কয়ার গ্রুপ শুধু ঔষধশিল্পে নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রাখেনি, বরং তার দূরদর্শিতার ধারাবাহিকতায় একের পর এক নতুন খাতে নিজেদের প্রসারিত করেছে। স্কয়ার হসপিটালসের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে তার মানবসেবার যে ব্রত কাজ করেছে, তার উত্তরসূরিরাও সেই একই আদর্শে সেবার মান নিশ্চিত করে চলেছেন। তার দর্শন ছিল, ব্যবসা শুধু মুনাফার জন্য নয়, বরং সমাজের কল্যাণে অবদান রাখার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে সিংগাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই ক্ষণজন্মা মানুষটি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে সমাজের সর্বস্তরে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। পাবনায় এস্ট্রাস খামার বাড়িতে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও মূল্যবোধের পথ ধরেই তার উত্তরসূরিরা এগিয়ে চলেছেন, এগিয়ে চলেছেন স্কয়ার পরিবারের প্রায় ৮৫ হাজার সদস্য, যা প্রমাণ করে স্যামসন এইচ চৌধুরী তার কাজের মধ্য দিয়ে আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।
আজকের তরুণ উদ্যোক্তার চোখে যখন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন জাগে, সেখানে স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবন এক নীরব প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় : শুভ ১০১তম জন্মদিন।
লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, স্টাফ রির্পোটার, সমকাল, পাবনা ও সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেসক্লাব।
এবিএম ফজলুর রহমান
স্টাফ রির্পোটার, সমকাল, পাবনা
ও
সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেসক্লাব।
মোবাইল নং ০১৭৩২-১১৭০১১
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং।
সম্পাদক ও প্রকাশক : একরামুল হক বেলাল
ঢাকা অফিস-২২,মা ভিলা ,পূর্ব তেজতুরী বাজার,ফার্মগেট-১২১৫,
ইমেইল-spnews17@gmail.com
রেলওয়ে পার্ক,পার্বতীপুর,দিনাজপুর। ০১৭১২৩৭০৮০০
© 2026 Songbad Protikkhon-Spnewsbd. All rights reserved.