
মাকসুদুল হক : আজকের নাগরিক কোলাহলে বাউল গান যখন বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছে, তখন কুষ্টিয়ার মরমী আসরগুলোতে একটি কণ্ঠ শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীর আধ্যাত্মিক দাগ কাটে। তিনি আর কেউ নন—শেখ জামাল উদ্দিন টুনটুন শাহ ফকির (সুধীমহলে টুনটুন বাউল নামে সমধিক পরিচিত)। তাঁর কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গানের অকৃত্রিমতা ও সুফিবাদী ভাবের এক অনন্য মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়।
শিকড় অনুসন্ধান ও পারিবারিক ট্র্যাজেডি
টুনটুন বাউলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৩ জানুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার মোহাম্মদবাজার থানার সেকেড়ডাঙ্গা গ্রামে। তাঁর পিতা আবদুস সাত্তার এবং মাতা জোহরা বেগম। তাঁরা পাঁচ ভাই ও দুই বোন। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি মেজ। ১৯৬৪ সালে তাঁদের পুরো পরিবার বীরভূম থেকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় চলে আসে। কিন্তু এখানে আসার মাত্র দুবছরের মাথায় ১৯৬৬ সালে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে তাঁর মা জোহরা বেগম ইন্তেকাল করেন। মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর ছোট বোনটির বয়স ছিল মাত্র ১৩ মাস।
মায়ের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পিতা আবদুস সাত্তার তীব্র মানসিক আঘাত পান এবং একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এই চরম পারিবারিক সংকটে দেবদূতের মতো এগিয়ে আসেন কুষ্টিয়ার কোর্টপাড়ার এম এম হোসেন রোডে বসবাসকারী তাঁর পুলিশ অফিসার মামা। তিনি আদরের ভগ্নিপতিকে নিজের কাছে নিয়ে এসে পরম যত্ন ও চিকিৎসা করান। মামার আশ্রয়ে বাবা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং পুরোপুরি ভালো হয়ে যান। মা মারা যাওয়ার পর দীর্ঘ ৩৭ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। পরবর্তীতে ভাইবোনেরা কাজকর্ম শুরু করে একসময় আলাদা হয়ে জীবন যুদ্ধ শুরু করেন। বর্তমানে তাঁদের তিন ভাই কুষ্টিয়াতেই বসবাস করছেন, তবে অপর দুই ভাই ইতোমধ্যে পরলোকগমন করেছেন।
শিক্ষা জীবন ও ভাব-দীক্ষা
কুষ্টিয়ায় আসার পর তিনি এখানকার ঐতিহ্যবাহী কুষ্টিয়া ইউনাইটেড স্কুল-এ ভর্তি হন এবং এই স্কুল থেকেই তিনি তাঁর মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। পারিবারিক স্থানান্তর এবং অল্প বয়স থেকেই বাউল দর্শনের প্রতি তীব্র অনুরাগের কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মূলত মাধ্যমিক স্তর পর্যন্তই ছিল। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে আধ্যাত্মিক ও ভাব-শিক্ষাই তাঁর জীবনকে বেশি ধন্য করেছে। কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রখ্যাত সাধক গুরু মোকসেদ আলী সাঁই-এর নিকট তিনি সঙ্গীতের দীক্ষা ও শাস্ত্রীয় তালিম নেন। পরবর্তীতে তাঁর প্রধান দীক্ষা গুরু বা শিক্ষাগুরু ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক নহির সাঁই।
জীবন সংগ্রাম: স্টিয়ারিং চাকা থেকে সুরের ভুবন
টুনটুন বাউলের জীবনের সবচেয়ে আলোর অধ্যায়টি হলো তাঁর জীবনসংগ্রাম। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ সময় তিনি ট্রাকচালক হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। অথচ হাতের স্টিয়ারিং চাকা ঘুরলেও তাঁর মন পড়ে থাকত একতারার তারে আর লালন সাঁইজির বাণীতে। গানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও, তাঁর ভেতরে ছিল এক মজ্জাগত নিষ্ঠা ও নিরলস সাধনা। ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে তিনি লালনগীতিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। Lives-এর সব কঠিন বাধাকে জয় করার মূলমন্ত্র নিয়ে তিনি বলেন, "জীবন জীবনের মতো শুরু হয়েছে। কোনো দিন কোনো বাধাকে বাধা মনে করিনি, সংকটকে সংকট ভাবিনি। গুরুর দোয়ায় সব অতিক্রম করেছি।" এই অসাধারণ নিষ্ঠাই একসময় তাঁকে ট্রাকের কেবিন থেকে তুলে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় সুরের মূল মঞ্চে।
চৌড়হাসের নিজস্ব আখড়াবাড়ি: সাধনার আঁতুড়ঘর
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার পাশাপাশি টুনটুন বাউলের সাধনার এক নিভৃত ও পরম আশ্রয় গড়ে উঠেছে তাঁর নিজের ঘরেই। কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস মোড়ের কাছে ফুলতলায় তাঁর নিজ বাসভবনটিই এখন একটি জীবন্ত আখড়াবাড়ি। সংসার জীবন আর পরমার্থিক সাধনাকে এক সুতোয় বেঁধে তিনি তাঁর এই চৌড়হাসের বাসভবনে আদরের ছোট বোনসহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসবাস করছেন এবং নিয়মিত লালন চৰ্চা ও বাউল সঙ্গীতের আসর জমিয়ে রাখেন। দেশ-বিদেশের বহু লালন অনুরাগী ও গবেষক সাঁইজির দর্শনের খোঁজে ছুটে আসেন চৌড়হাসের এই সঙ্গীতময় আঙিনায়।
লালন দর্শন, সংগীত সাধনা ও জীবনসত্য
সুর ও সাধনা নিয়ে টুনটুন ফকিরের উপলব্ধি অত্যন্ত গভীর। তিনি বলেন, "লালনগীতি গাইতে ভালো লাগে, মানুষের গানগুলো শুনতেও ভালো লাগে। মানুষ ভালোবাসে বলেই আমরা ভালো গাইতে পারি। আমি লালনের সাধু। সাধুদের জীবন মানে সাধারণ খাওয়া আর গান; সেখানে কোনো লোভ বা লালসা নেই। সাঁইজির গান গেয়ে, তাঁর দর্শন বিশ্বাস করে আমরা পরম সত্যের দেখা পেয়েছি।" বর্তমানে লালনগীতি নিয়ে অনেক বাণিজ্য হলেও উনার পরম তৃপ্তি যে গুরুর দোয়ায় ও আল্লাহর রহমতে তাঁর সংসার এই গান গেয়েই চমৎকার চলে যাচ্ছে। জি-সিরিজ থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘ফুলের মর্ম জানতে হয়’ অ্যালবামটি সুধী মহলে দারুণ প্রশংসিত হয়।
সাধুসঙ্গ, বিশ্বজনীন মানবতাবাদ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চ: প্রথম বিদেশ সফর ও চীন বিজয়ের গল্প
চৌড়হাসের আখড়াবাড়িতে আয়োজিত সাধুসঙ্গে দেশ-বিদেশের বহু সাধু-ভক্তের সমাগম ঘটে। সেখানে লালন সাঁইজির মানবতাবাদী আদর্শ, গানের বাণী ও তাঁর জীবনের নিগূঢ় অর্থ নিয়ে আলোচনা ও ভাববিনিময় হয়। টুনটুন বাউল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সমাজে নেতিবাচক চিন্তার স্বার্থবাদীরাই মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে।
তাঁর জীবনের অন্যতম চমৎকার এবং জাদুকরী আন্তর্জাতিক অধ্যায়টি গড়ে উঠেছিল ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে, যখন তিনি সাঁইজির মাজারে নিভৃতে সময় কাটাতেন ও গান-বাজনা করতেন। ঠিক সেই সময়ে চীন থেকে এক অধ্যাপক মাজার প্রাঙ্গণে ঘুরতে আসেন। পরিচয়ের পর সেই অধ্যাপক মুগ্ধ হয়ে তাঁদের পাশে বসে লালনের গান শুনতেন। এরপর দীর্ঘ ৩৪ বছর তাঁদের আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু ৩৪ বছর পর হঠাৎ একদিন ছেঁউড়িয়ার সাঁইজির মাজার প্রাঙ্গণেই আবার তাঁদের দেখা হয়। দেখামাত্রই দুজনে দুজনকে চিনে ফেলেন এবং পরম আনন্দে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেই চীনা অধ্যাপক টুনটুন বাউলের অনেক গান রেকর্ড করে নেন এবং পরম আগ্রহে গানগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝে নেন। পরবর্তীতে সেই অধ্যাপকের আমন্ত্রণে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে টুনটুন বাউল প্রথম চীনে পাড়ি জমান।
বিশ্বের বহু দেশে লালনের গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে টুনটুন ফকির পরম আবেগে বলেন, " can't express in words how much respect foreigners have given me. They don't understand my language, yet they are mesmerized listening to my songs. Before going to different international festivals, the lyrics of our songs are translated into English or their native language so that they can understand the essence. They become so happy just seeing me climb on the stage with an Ektara. Actually, people of any country feel inner joy just by listening to the melody, even if they don't directly understand the words of Saiji's songs. The lyrics, melody, rhythm, and the artist's expression of our Lalon Geeti—everything seems very sweet to them. That is why they respect Saiji so much. Today, borrowing this tradition, many people from home and abroad are trying to be like us."
লালন সাঁইজির বাণীর গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, সাঁইজি বলেছেন—‘বেদ বিধির পর শাস্ত্র কানা / আর এক কানা মন আমার / এসব দেখি কানার হাটবাজার।’ এই মোহগ্রস্ত ও অন্ধ ‘কানার হাটবাজার’ থেকে সাঁইজির আদর্শের আলো ছড়ানোর মাধ্যমে মানুষকে কীভাবে উদ্ধার করা যায়, সেই সত্যের সন্ধানই তাঁরা জীবনভর দিয়ে চলেছেন। টুনটুন ফকিরের ভাষায়, "এই সাধনা আমাদের সারা জীবন করতে হয়। সাধনার তো কোনো শেষ নেই।"
গুরুর আশীর্বাদ ও খ্যাতির আলো
আজ দেশ-বিদেশে যে বিপুল খ্যাতি ও আলোর মাঝে তিনি আছেন, তা নিয়ে এই পরম বিনয়ী সাধক বলেন, "সাঁইজির অনুসারীরা আমার সঙ্গেই আছেন, আমিও তাঁদের সঙ্গে আছি। নিজেই চিন্তা করি খ্যাতির আলো কীভাবে এলো? সবই সাঁইজির কৃপা। জীবনে অনেক মানুষ পেয়েছি, অনেক জায়গায় গিয়েছি, অনেক শিখেছি। কীভাবে হচ্ছে বলতে পারব না। গুরু দুহাত ধরে দোয়া করেছেন বলেই আজ এই ভাগ্য পেয়েছি। তখন বয়স কম ছিল, কণ্ঠ আরও ভালো ছিল, গুরু তাই খুব ভালোবাসতেন।"
পারিবারিক জীবন ও উত্তরাধিকার
টুনটুন বাউল ১৯৭৪ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক। তাঁর সন্তান ও সংসারের খরচ চললেও ব্যাংকে কোনো জমানো টাকা নেই; তাঁর ভাষায় জীবনটি হলো ‘আনা-খাওয়া-শেষ’। বৈষयिक অভাব ও সংকট থাকলেও তিনি সেগুলোকে কখনো ‘সংকট’ মনে করেন না। পরিবারের সন্তানদের মধ্যে তাঁর ছেলে সুমন সবার ছোট。 সুমন পড়াশোনায় এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আর অগ্রসর হননি। তবে সে বর্তমানে বাবার ছায়াসঙ্গী হিসেবে সবসময় সাথে থাকে, বাবার গানে তবলায় সংগত করে এবং নিজেও গান গায়। বংশে একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ গান না করলেও ছেলের সুরের বিকাশ নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি পরম বিশ্বাসে বলেন, "ইনশাল্লাহ হয়তো একদিন তারও পূর্ণ বিকাশ ঘটবে।"
টেলিভিশনে প্রথম আত্মপ্রকাশ
শিল্পীর চোখে শিল্পী
টুনটুন বাউলের গানের ভক্ত কেবল সাধারণ শ্রোতারাই নন, তাঁর সুরের ছোঁয়ায় ক্যানভাসে তুলি ধরেছেন চিত্রশিল্পীরাও। স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় লালনের আখড়ায় মোহিত হয়ে এই শিল্পীর গান শুনতে শুনতেই অনেক চিত্রশিল্পী ‘এগ টেম্পেরা’ (Egg Tempera) মাধ্যমে ক্যানভাসে লালন দর্শনকে ফুটিয়ে তুলেছেন—যা আশির দশকে জয়নুল গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিল। ফরিদা পারভীনের পর টুনটুন বাউলই বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতা ও শিল্পমনস্ক মানুষকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে চলেছেন। তাঁর এই সুর-সাধনা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক বাঙালির আত্মায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : একরামুল হক বেলাল
ঢাকা অফিস-২২,মা ভিলা ,পূর্ব তেজতুরী বাজার,ফার্মগেট-১২১৫,
ইমেইল-spnews17@gmail.com
রেলওয়ে পার্ক,পার্বতীপুর,দিনাজপুর। ০১৭১২৩৭০৮০০
© 2026 Songbad Protikkhon-Spnewsbd. All rights reserved.