প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ১২:৩২ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ১০:৩২ পি.এম
সুঁই-সুতার ফোঁড়ে বদলে যাচ্ছে ২০০ নারীর জীবন

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,পলাশবাড়ী(গাইবান্ধা) প্রতিনিধি: সকালের নরম আলো ফুটতেই প্রতাপ ছয়ঘরির একটি বাড়ির আঙিনা মুখর হয়ে ওঠে সেলাই মেশিনের খটখট শব্দে। কোথাও কাপড় কাটা হচ্ছে, কোথাও চলছে সেলাই। আবার কোনো নারীর আঙুলে সূচ-সুতা, কাপড়ের ওপর ফুটে উঠছে ফুল, পাখি কিংবা লতাপাতার নকশা। একসময় যেসব হাতে সংসারের টানাপোড়েনের হিসাব কষতে হতো, সেই হাতেই এখন তৈরি হচ্ছে আয়ের পথ। আর এর পেছনে রয়েছেন এক মা ও তাঁর মেয়ে—মোছা. লতিফা বেগম ও তাসলিমা আক্তার তানজিনা।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রতাপ ছয়ঘরি এলাকায় তাঁদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে ছোট্ট একটি এমব্রয়ডারি পল্লী। শুরুটা হয়েছিল সীমিত সামর্থ্য আর বড় স্বপ্ন নিয়ে। এখন সেখানে কাজের সুযোগ পেয়েছেন এলাকার প্রায় ২০০ নারী। কারও সংসারে বাড়ছে স্বচ্ছলতা, কেউ পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন নিজের আয়ে, আবার কেউ নিজের প্রয়োজন মেটাতে পরিবারের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছেন।
ছোট শুরু, বড় স্বপ্ন ২০২২ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের প্রশিক্ষণ নিয়ে অর্ডারের ভিত্তিতে পোশাকে নকশার কাজ শুরু করেন লতিফা ও তাসলিমা। প্রথম দিকে অর্ডার ছিল অল্প। পরিচিতজন ও স্থানীয় ক্রেতাদের কাছ থেকেই কাজ পেতেন তাঁরা। তবে হাতের কাজের মান ভালো হওয়ায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে অর্ডার।
কাজ বাড়লেও সামনে আসে মূলধনের সংকট। কাপড়, সুতা, নকশার উপকরণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ায় বিআরডিবির ক্ষুদ্র ঋণ। সেই অর্থে কাঁচামাল ও সরঞ্জাম কিনে কাজের পরিধি বাড়াতে থাকেন মা-মেয়ে।
একসময় তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন আশপাশের নারীরা। ছোট পরিসরের উদ্যোগটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় কর্মসংস্থানের একটি কেন্দ্রে।
ঘরের কাজের ফাঁকে আয় বর্তমানে পল্লীটিতে শাড়ি, থ্রি-পিস, সালোয়ার-কামিজসহ বিভিন্ন পোশাকে নকশার কাজ হচ্ছে। কেউ পোশাক তৈরি করছেন, কেউ এমব্রয়ডারি করছেন, আবার কেউ সেলাই ও পোশাকে শেষ ছোঁয়া দিচ্ছেন। অর্ডারের মাধ্যমে তৈরি পোশাক যাচ্ছে বিভিন্ন জেলাতেও।
এখানে কাজ করছেন কলেজপড়ুয়া হাসি খাতুন ও আদুরি আক্তারও। পড়াশোনার ফাঁকে তাসলিমার কাছ থেকে নকশার কাজ শিখে তাঁরা এখন নিয়মিত কাজ করছেন। এতে মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে তাঁদের।
হাসি ও আদুরির মতো অনেক নারীর কাছেই এ কাজ শুধু বাড়তি আয় নয়; নিজের প্রয়োজন নিজে মেটানোর আত্মবিশ্বাসও।
আরও বড় করার স্বপ্ন লতিফা বেগমের হিসাবে, কারখানার সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভ থাকে। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না তিনি। একটি শেড, এমব্রয়ডারি মেশিন, উন্নত সরঞ্জাম ও কাঁচামাল কেনার পাশাপাশি অর্ডার বাড়াতে প্রয়োজন আরও বিনিয়োগ।
লতিফা বলেন, তাঁদের প্রায় ৫ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত মূলধন প্রয়োজন। সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা পেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আরও নারীর কর্মসংস্থান করা সম্ভব হবে।
মেয়ে তাসলিমা আক্তার তানজিনার স্বপ্ন আরও বড়। স্থানীয় এই উদ্যোগকে একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত করতে চান তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁদের তৈরি পোশাক পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আরও বেশি নারীকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
উদ্যোগে পাশে থাকার আশ্বাস সাদুল্লাপুর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. সালাউদ্দিন বলেন, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এমব্রয়ডারি ও হস্তশিল্পের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লতিফা ও তাঁর মেয়েকে ঋণসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাঁদের জন্য একটি শেড স্থাপনেরও চেষ্টা করা হবে।
প্রতাপ ছয়ঘরির এই পল্লীতে তাই শুধু কাপড়ের ওপর নকশা তৈরি হচ্ছে না। প্রতিটি সূচের ফোঁড়ের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। একসময় যে নারীদের জীবনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ছিল, তাঁদের অনেকের হাতেই এখন নিজের উপার্জনের চাবিকাঠি। একটি মা-মেয়ের ছোট উদ্যোগ কীভাবে ধীরে ধীরে প্রায় ২০০ নারীর কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিতে পারে—প্রতাপ ছয়ঘরির এমব্রয়ডারি পল্লী তারই জীবন্ত উদাহরণ।
সম্পাদক ও প্রকাশক : একরামুল হক বেলাল
ঢাকা অফিস-২২,মা ভিলা ,পূর্ব তেজতুরী বাজার,ফার্মগেট-১২১৫,
ইমেইল-spnews17@gmail.com
রেলওয়ে পার্ক,পার্বতীপুর,দিনাজপুর। ০১৭১২৩৭০৮০০
© 2026 Songbad Protikkhon-Spnewsbd. All rights reserved.