প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৭, ২০২৬, ৫:০০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ৭, ২০২৬, ২:৪৭ এ.এম

লেখক ; মুহাম্মদ রাশেদ খান
ভুমিকা:
আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবন ও স্বাধীনতা ভারতের সমসাময়িক রাজনীতি এবং সমাজব্যবস্থার অন্যতম এক জটিল ও সংবেদনশীল অধ্যায়। রাজ্যটির ভৌগোলিক অবস্থান, দেশভাগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ধারাবাহিক অভিবাসনের কারণে এখানকার মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ কাঠামো অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, নাগরিকত্ব আইন এবং উচ্ছেদ অভিযানের মতো নানাবিধ রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের ফলে এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও সামাজিক স্বাতন্ত্র্য এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে আসামের মুসলিমদের জীবনযাত্রা, আইনি সংগ্রাম এবং অস্তিত্বের লড়াই বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনার বিষয়।
আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠী রাজ্যটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০%。 তারা মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত:
ঐতিহাসিক আদিবাসী অসমীয়া মুসলিম (যেমন—দেশি, গোরিয়া, মোরিয়া) এবং বাংলাভাষী অভিবাসী মুসলিম。 জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) এবং উচ্ছেদ অভিযানের মতো রাষ্ট্রীয় নীতিমালার কারণে তাদের নাগরিকত্ব, ভূমি অধিকার ও নিরাপত্তা চরম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আসামের মুসলিমদের জীবন ও স্বাধীনতার সার্বিক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
জনগোষ্ঠীর বিভাজন:
আসামে বসবাসরত মুসলমানদের একটি বড় অংশ শত শত বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে এবং মূল ধারার অসমীয়া সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ。 অন্য দিকে, ব্রিটিশ শাসনামল ও তৎপরবর্তী সময়ে অভিবাসিত বাংলাভাষী মুসলিমদের 'না-অসমীয়া' (নতুন অসমীয়া) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়。
নাগরিকত্ব ও আইনি সংকট:
অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে দীর্ঘকাল ধরে বাংলাভাষী মুসলিমদের আইনি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি)-এর চূড়ান্ত খসড়া থেকে প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছিল, যার ফলে তাদের রাষ্ট্রহীন হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়।
ভূমি ও জীবিকার অধিকার:
আসামের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলে বসবাসকারী মুসলিমদের অবৈধ দখলদার আখ্যা দিয়ে উচ্ছেদ করা হয়。 এসব উচ্ছেদ অভিযানে অনেক সময় প্রাণহানি ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান:
আসামের রাজনীতিতে মুসলিম ভোট একটি বড় নিয়ামক。 তবে, রাজ্যের মূলধারার রাজনীতি ও স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রায়ই তাদের বিরুদ্ধে প্রান্তিককরণের অভিযোগ করা হয়。
সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য:
আদিবাসী মুসলিমরা অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা করলেও, অভিবাসী মুসলিমদের ওপর স্থানীয় কৃষ্টি ও ভাষা আত্মস্থ করার জন্য প্রতিনিয়ত সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ থাকে。
ঐতিহাসিক পটভূমি:
আসামে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আগমন ও স্থায়ী বসবাসের ইতিহাস দীর্ঘ এবং বহুমুখী। তাদের এই ঐতিহাসিক পটভূমিকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে আলোচনা করা যায়:
১. আদিবাসী বা খিলঞ্জিয়া মুসলিম (মধ্যযুগীয় আগমন):
১৩শ শতাব্দী থেকে শুরু করে ১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আসামের তৎকালীন কামরূপ ও আহোম সাম্রাজ্যে মুসলমানদের আগমন ঘটে। তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়ে "অসমীয়া মুসলিম" হিসেবে পরিচিত হন। এদের প্রধান পাঁচটি গোষ্ঠী হলো:
দেশি (Deshi):
১২০৫ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির কামরূপ অভিযানের সময় স্থানীয় কোচ-রাজবংশী ও মেচ উপজাতির প্রধান 'আলী মেচ' ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর অনুসারীরাই আসামের প্রাচীনতম মুসলিম গোষ্ঠী বা 'দেশি' নামে পরিচিত।
গোরিয়া (Goriya):
গৌড় (প্রাচীন বাংলা) থেকে আসা মুসলিম কারিগর, যুদ্ধবন্দী ও কূটনীতিকদের বংশধরদের 'গোরিয়া' বলা হয়।
মোরিয়া (Moriya):
১৫৩২ সালে আহোম রাজ্যের বিরুদ্ধে তুরবক খানের নেতৃত্বে মোগল বা আফগান বাহিনীর অভিযানের পর বন্দী সৈন্যদের আসামে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন দেওয়া হয়। তাঁরা মূলত পিতল ও কাঁসা শিল্পের কাজে নিয়োজিত হন।
সৈয়দ (Syed):
পঞ্চদশ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে ইসলাম প্রচারের জন্য আসা সুফি সাধকদের উত্তরসূরি তাঁরা। এদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন বিখ্যাত সুফি সাধক আজান ফকির।
জুলহা (Julha): এরা মূলত তাঁতী সম্প্রদায়। আহোম ও ব্রিটিশ আমলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এদের নিয়ে আসা হয়।
১. বাংলাভাষী বা অভিবাসী মুসলিম (ব্রিটিশ আমল):
১৮২৬ সালে ইয়ান্দাবু চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা আসামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এখানকার কৃষিব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে।
ভূমি সংস্কার ও অভিবাসন:
ব্রিটিশ শাসকরা রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে আসামের পতিত ও জঙ্গলঘেরা জমি চাষযোগ্য করার উদ্যোগ নেয়। এই কাজের জন্য তারা অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন পূর্ববঙ্গ (যেমন: ময়মনসিংহ, রংপুর, ঢাকা, পাবনা) থেকে বিপুল সংখ্যক কঠোর পরিশ্রমী বাঙালি মুসলিম কৃষককে আসামে আসার জন্য উৎসাহিত করে।
লাইন সিস্টেম (Line System):
১৯২০-এর দশকে অভিবাসীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেলে স্থানীয় অসমীয়া ও উপজাতিদের সুরক্ষায় ব্রিটিশরা 'লাইন সিস্টেম' চালু করে, যা অভিবাসী ও স্থানীয়দের বসতির মধ্যে একটি ভৌগোলিক সীমারেখা টেনে দেয়।
দেশভাগ (১৯৪৭):
ভারতের স্বাধীনতা এবং দেশভাগের সময় সিলেট অঞ্চলের একটি বড় অংশ গণভোটের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) যুক্ত হলেও, কাছাড় ও বরাক উপত্যকার একটি বিশাল বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠী আসামের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে থেকে যায়।এই দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক ধারার কারণে আসামের মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন আজও দুই মেরুতে বিভক্ত।
নাগরিকত্ব (NRC) সংকট:
আসামের মুসলিমদের, বিশেষ করে বাংলাভাষী মিয়া মুসলিমদের জীবন ও স্বাধীনতায় সবচেয়ে বড় আইনি ও মানসিক আঘাতটি এসেছে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) বা নাগরিকত্ব সংকট থেকে。 এটি কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের অস্তিত্বের লড়াই। এনআরসি সংকটের মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
ভিত্তি বছর (Cut-off Date): ১৯৮৫ সালের ঐতিহাসিক আসাম চুক্তি (Assam Accord) অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ মধ্যরাতকে নাগরিকত্ব প্রমাণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। আবেদনকারীদের প্রমাণ করতে হয়েছে যে তাদের বা তাদের পূর্বপুরুষদের নাম ১৯৭১ সালের আগের ভোটার তালিকায় বা ১৯৫১ সালের প্রথম এনআরসিতে ছিল。১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ: দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পর ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা থেকে ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষের নাম বাদ পড়ে。 বাদ পড়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই হলো দরিদ্র এবং নিরক্ষর মুসলিম ও হিন্দু বাঙালি।
নথি ভিত্তিক জটিলতা ও নদী ভাঙন:
আসামের ব্রহ্মপুত্র নদ ও তার শাখা নদীগুলোর ক্রমাগত ভাঙনের কারণে চরাঞ্চলের মুসলিমদের ঘন ঘন বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়। এর ফলে অনেক পরিবারের পক্ষে কয়েক দশকের পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক ও বংশগত দলিলপত্র (Legacy Data) সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়নি। সামান্য বানানের ভুল বা লিঙ্কেজ নথির অভাবে বহু বৈধ নাগরিকের আবেদনও নাকচ হয়ে যায়。
বিদেশী ট্রাইব্যুনাল (Foreigners' Tribunals) ও ডি-ভোটার (D-Voter):
যাদের নাম তালিকায় আসেনি অথবা যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচন কমিশন সন্দেহ প্রকাশ করেছে, তাদের 'সন্দেহভাজন ভোটার' বা 'ডি-ভোটার' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই মানুষদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে আধা-বিচারবিভাগীয় সংস্থা 'ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে' দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি লড়াই লড়তে হচ্ছে।
ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক:
ট্রাইব্যুনালে বিদেশী ঘোষিত ব্যক্তিদের জন্য আসামের বিভিন্ন স্থানে ডিটেনশন ক্যাম্প (বর্তমানে ট্রানজিট ক্যাম্প বলা হয়) তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বছরের পর বছর বন্দি থাকার মানসিক ও সামাজিক আতঙ্ক মুসলিম পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবন ও স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে。
বর্তমান স্থবিরতা ও সিএএ (CAA):
ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর বহু বছর পার হলেও এখনো এটি চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কার্যকর করা হয়নি。 এর মাঝে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) চালু হওয়ায় অমুসলিমদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়ার বিকল্প পথ তৈরি হলেও, তালিকা থেকে বাদ পড়া মুসলিমরা স্থায়ীভাবে 'রাষ্ট্রহীন' বা ডি-ভোটার হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন。
আসাম আন্দোলন (১৯৭৯-১৯৮৫):
আসাম আন্দোলন (১৯৭৯-১৯৮৫) ছিল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ, তীব্র এবং রক্তক্ষয়ী জনআন্দোলন。 'সদৌ আসাম ছাত্র সংস্থা' (AASU) এবং 'সদৌ আসাম গণ সংগ্রাম পরিষদ' (AAGSP)-এর নেতৃত্বে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ (পরবর্তীতে বাংলাদেশ) থেকে আসা "অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের" শনাক্তকরণ ও বহিষ্কারের দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। এই ৬ বছরের সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আসামের মুসলিমদের, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমানদের জীবন, নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্বের অধিকারকে আমূল বদলে দিয়েছিল। আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট, মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব এবং এর পরিণতি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আন্দোলনের সূত্রপাত ও মূল দাবি (১৯৭৯):
মঙ্গলদৈ উপ-নির্বাচন:
১৯৭৮ সালে আসামের মঙ্গলদৈ লোকসভা কেন্দ্রের উপ-নির্বাচনের সময় ভোটার তালিকায় হঠাৎ বিপুল সংখ্যক সন্দেহভাজন বিদেশী নাগরিকের নাম প্রকাশ পায়। এটি স্থানীয় অসমীয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও জনমিতি (Demography) পরিবর্তনের আতঙ্ক তৈরি করে।
থ্রি-ডি (3Ds) দাবি:
১৯৭৯ সালের জুন মাসে ছাত্র সংগঠন আসু (AASU) পূর্ণাঙ্গ আন্দোলন শুরু করে। তাদের মূল দাবি ছিল তিনটি—ডিটেকশন (বিদেশী শনাক্তকরণ), ডিলিটেশন (ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া) এবং ডিপোর্টেশন (দেশ থেকে বহিষ্কার করা)।
১. মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ'বহিরাগত' থেকে 'বিদেশী' ট্যাগ:
আন্দোলনটি শুরুতে আসামের বাইরের সকল অ-অসমীয়া বা "বহিরাগত" (Bohiragato)-দের বিরুদ্ধে থাকলেও, দ্রুতই এর লক্ষ্যবস্তু বদলে যায়। আন্দোলনকারীরা বাংলাভাষী মুসলমানদের ঢালাওভাবে "বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী" হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে।
নেলি হত্যাকাণ্ড (Nellie Massacre, ১৯৮৩):
আসাম আন্দোলনের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও নৃশংসতম অধ্যায় ছিল ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির নেলি হত্যাকাণ্ড। তৎকালীন বিতর্কিত বিধানসভা নির্বাচন বয়কটের ডাক অমান্য করায় চরমপন্থী উগ্রবাদীরা মরিগাঁও জেলার নেলি এবং তার আশেপাশের ১৪টি গ্রামে একযোগে হামলা চালায়। মাত্র ৬ ঘণ্টার এই পৈশাচিক সহিংসতায় ২,১৯১ জনেরও বেশি নিরীহ বাংলাভাষী মুসলিমকে (যাদের বেশিরভাগই ছিল শিশু ও নারী) কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
আদিবাসী বনাম অভিবাসী মুসলিম ফাটল:
এই আন্দোলন অসমীয়া সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাওয়া আদিবাসী বা খিলঞ্জিয়া মুসলিমদের সাথে বাংলাভাষী মুসলিমদের একটি বড় মানসিক ও সামাজিক দূরত্ব তৈরি করে দেয়।
১. আসাম চুক্তি (Assam Accord, ১৯৮৫) এবং এর আইনি পরিণতি:
১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর উপস্থিতিতে ভারত সরকার এবং আন্দোলনকারী নেতাদের মধ্যে ঐতিহাসিক আসাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে এই দীর্ঘ আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলো মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়:
নাগরিকত্বের ভিত্তি বছর (Cut-off Date):
চুক্তির ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয় যে, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ মধ্যরাতের পর আসামে প্রবেশ করা সমস্ত বিদেশীকে শনাক্ত ও বহিষ্কার করা হবে। এটি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের নাগরিকত্ব আইন (যা ১৯৪৮ সালকে ভিত্তি ধরে) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
ভোটাধিকার স্থগিতকরণ:
১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের মধ্যে যারা আসামে এসেছেন, তাদের থাকার অনুমতি দেওয়া হলেও ১০ বছরের জন্য তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
৬ নম্বর ধারা (Clause 6):
অসমীয়া জনগণের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ভাষাগত পরিচয় রক্ষায় বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বর্তমানে এই ধারার অপব্যবহার করে মুসলিমদের ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করার অভিযোগ উঠছে।
আসাম আন্দোলন কেবল ৮৫৫ জনেরও বেশি ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের ইতিহাস নয়, বরং এটি আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের চিরতরে "সন্দেহের তালিকায়" ফেলে দেয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বর্তমানের ডি-ভোটার (D-Voter) প্রথা, বিদেশী ট্রাইব্যুনাল এবং বিতর্কিত এনআরসি (NRC) সংকটের আইনি ভিত্তি রোপিত হয়েছিল।
সরকারি উচ্ছেদ অভিযান (Eviction Drives):
আসামে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকারি উচ্ছেদ অভিযান (Eviction Drives) রাজ্যটির মুসলিমদের, বিশেষ করে বাংলাভাষী মিয়া মুসলিমদের জীবন ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এক নতুন এবং চরম সংকটের রূপ নিয়েছে। চরাঞ্চল, বনাঞ্চল এবং সরকারি খাস জমি থেকে তথাকথিত "অবৈধ দখলদার" উচ্ছেদের এই নীতি এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকারকে চরমভাবে বিঘ্নিত করছে। উচ্ছেদ অভিযানের মূল প্রভাব ও এর পেছনের বাস্তবতা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অভিযানের ভয়াবহতা ও পরিসংখ্যানব্যাপক বাস্তুচ্যুতি:
২০২১ সালে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে উচ্ছেদ অভিযান তীব্র গতি লাভ করে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ২০ হাজারেরও বেশি পরিবার (যার সমতুল্য প্রায় ১ লক্ষের বেশি মানুষ) উচ্ছেদের শিকার হয়েছে, যাদের সিংহভাগই দরিদ্র মুসলিম।
বুলডোজার নীতি ও লক্ষাধিক বিঘা জমি উদ্ধার:
সরকার দাবি করেছে যে তারা সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সত্র (বৈষ্ণব মঠ)-এর জমি মুক্ত করতে ৪২ হাজার একরেরও (প্রায় ১.৫ লক্ষ বিঘা) বেশি ভূমি "অবৈধ দখলদারদের" হাত থেকে উদ্ধার করেছে। এই অভিযানগুলোতে কোনো প্রকার আগাম নোটিশ ছাড়াই মানুষের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বহু অভিযোগ উঠেছে。
১. পরিবেশগত সংকট বনাম রাজনৈতিক প্রচারণা:
নদী ভাঙন ও বাস্তুহীনতার চক্র:
উচ্ছেদের শিকার হওয়া অধিকাংশ মানুষ কোনো "অনুপ্রবেশকারী" বা ইচ্ছাকৃত দখলদার নয়। প্রতি বছর আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙনে হাজার হাজার প্রান্তিক কৃষক তাদের নিজেদের চাষের জমি হারায়। নদীগর্ভে জমি হারিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা বাধ্য হয়ে সরকারি খাস জমি বা চরাঞ্চলে আশ্রয় নেয়।
“ল্যান্ড জিহাদ" এবং অনুপ্রবেশের তকমা:
এই পরিবেশগত ট্র্যাজেডিকে আসাম সরকার রাজনৈতিকভাবে "ল্যান্ড জিহাদ" বা "বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের ভূমি গ্রাস" বলে প্রচার করে। ফলে উচ্ছেদ হওয়া মুসলিমরা কোনো পুনর্বাসন বা আইনি সাহায্য পায় না, যা তাদের স্থায়ীভাবে যাযাবরে পরিণত করছে।
১. সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন:
ধলপুর ও গোয়ালপাড়া ট্র্যাজেডি:
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে দারাং জেলার ধলপুরে এবং পরবর্তীতে গোয়ালপাড়া ও বিশ্বনাথ জেলার উচ্ছেদ অভিযানগুলোতে চরম সহিংসতা দেখা গেছে। ধলপুরে পুলিশের গুলিতে মইনুল হক নামের এক কৃষকের মৃত্যুর ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সাম্প্রতিক ২০২৫ ও ২০২৬ সালের অভিযানগুলোতেও পুলিশের গুলিতে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে ত্রিপলের তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
পুনর্বাসনে বৈষম্য:
উচ্ছেদ অভিযানে অনেক সময় অ-মুসলিম বা উপজাতি পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে আসাম সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, অ-মুসলিম ও খিলঞ্জিয়া পরিবারগুলোকে দ্রুত বিকল্প জমি ও আর্থিক সাহায্য দিয়ে পুনর্বাসন করা হলেও মুসলিম পরিবারগুলোকে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। উচ্ছেদ অভিযানের এই ধারাবাহিকতা আসামের মুসলিমদের শুধু তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা থেকেই উচ্ছেদ করছে না, বরং তাদের আইনিভাবে নাগরিকত্ব প্রমাণের লড়াইকেও আরও কঠিন করে তুলছে।
বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান:
আসামে মুসলিমদের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত জটিল এবং এটি প্রধানত দুটি সমান্তরাল ধারায় বিভক্ত। একদিকে আদিবাসী বা খিলঞ্জিয়া মুসলিমদের সামাজিক স্বীকৃতির চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে বাংলাভাষী 'মিয়া' মুসলিমরা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিককরণের শিকার হচ্ছেন।২০২৬ সালের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. 'বিভাজন ও শাসন' নীতি এবং সামাজিক পরিচয়:
খিলঞ্জিয়া বনাম মিয়া বিভাজন:
আসামের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাজ্যের মুসলিমদের স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে। সরকারিভাবে গোরিয়া, মোরিয়া, দেশি, সৈয়দ এবং জুলহা—এই ৫টি মুসলিম গোষ্ঠীকে 'খিলঞ্জিয়া বা আদিবাসী অসমীয়া মুসলিম' হিসেবে সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
মিয়া মুসলিমদের প্রান্তিককরণ:
রাজ্যের মোট মুসলিম জনসংখ্যার সিংহভাগ (প্রায় ৬০-৬৫%) হলো বাংলাভাষী মিয়া মুসলিম। সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের নীতি কেবল আদিবাসী মুসলিমদের সুরক্ষার জন্য, মিয়া মুসলিমদের জন্য নয়। এর ফলে মিয়া মুসলিমরা এক প্রকার সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি।
১. রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের সংকটভোটাধিকার ও নীতিগত চাপ:
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মিয়া মুসলিমদের ভোট নিয়ে নানা রাজনৈতিক শর্ত ও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন।
প্রতিনিধিত্ব হ্রাস:
আসামের রাজনীতিতে একসময় মুসলিমরা 'কিংমেকার' বা সরকার গঠনের বড় নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আসন পুনর্বিন্যাস (Delimitation) এবং তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে বিধানসভায় মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে কম সংখ্যক মুসলিম প্রতিনিধি বিধানসভায় আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তন:
দীর্ঘ সময় ধরে এআইইউডিএফ (AIUDF) নেতা বদরুদ্দিন আজমল বাংলাভাষী মুসলিমদের একক রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আজমলের বিশাল ব্যবধানে পরাজয়ের পর থেকে মুসলমান ভোটারদের সমর্থন ব্যাপকভাবে কংগ্রেস বা অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
১. আইনি ও সামাজিক সংস্কারের প্রভাব:
বহুবিবাহ ও বাল্যবিয়ে বিরোধী আইন:
আসাম সরকার আইন করে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করেছে। এর পাশাপাশি বাল্যবিয়ে রোধে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপের কারণে বহু মুসলিম যুবক ও ধর্মীয় গুরু আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে সমালোচকদের দাবি, উপজাতিদের এই আইনের বাইরে রেখে মূলত মুসলিমপ্রধান জেলাগুলোকে লক্ষ্য করেই এটি কার্যকর করা হচ্ছে।
আর্থ-সামাজিক অনগ্রসরতা:
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার চরাঞ্চলে বসবাসকারী লাখ লাখ মিয়া মুসলিম চরম দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, নদী ভাঙন এবং স্বাস্থ্যহীনতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। নাগরিকত্ব প্রমাণের আইনি লড়াই লড়তে গিয়ে এই জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছে।
চরাঞ্চলের (Char Area) জীবনসংগ্রাম ও পরিবেশগত সংকট:
আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবন ও স্বাধীনতার আলোচনাটি অসমাপ্ত থেকে যাবে যদি এর সাথে চরাঞ্চলের (Char Area) জীবনসংগ্রাম ও পরিবেশগত সংকটকে যুক্ত করা না হয়। আসামের মোট মুসলিম জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ, বিশেষ করে বাংলাভাষী ‘মিয়া’ মুসলিমরা ব্রহ্মপুত্র নদ এবং তার উপনদীগুলোর বুকে জেগে ওঠা অস্থায়ী বালুচর বা ‘চরে’ বসবাস করে। তাদের দৈনন্দিন জীবন জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভাঙন এবং রাষ্ট্রীয় সন্দেহের এক নির্মম বেড়াজালে বন্দি।চরাঞ্চলের এই দ্বৈত সংকট (পরিবেশগত ও নাগরিকত্ব) নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:
১. ভৌগোলিক অস্থিরতা ও অস্থায়ী জীবন (Impermanence of Life) চলমান ভূখণ্ড:
‘চর’ বা ‘চাপরি’ হলো নদীর পলি জমে তৈরি হওয়া অত্যন্ত অস্থায়ী দ্বীপ। প্রতি বছরের বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের তীব্র স্রোতে পুরোনো চর ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় এবং অন্য কোনো প্রান্তে নতুন চরের সৃষ্টি হয়।
যাযাবর জীবনযাত্রা:
চরের মানুষদের জীবন গড়ে উঠেছে এই অস্থায়ী মাটির ওপর। ঘর ভেঙে গেলে তারা ঘরের টিন, বাঁশ এবং গবাদি পশু নৌকায় তুলে নিয়ে অন্য কোনো নতুন চরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। একটি সাধারণ চরের পরিবারকে তাদের জীবদ্দশায় গড়ে ৫ থেকে ১০ বার বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়।
১. জলবায়ু পরিবর্তন ও তীব্র বন্যা সংকট (Climate Vulnerability):
অকাল বন্যা ও অতিবৃষ্টি:
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় আসামে বন্যার তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি বহুগুণ বেড়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরাঞ্চলগুলো বছরের ৪ থেকে ৫ মাস সম্পূর্ণ পানির নিচে নিমজ্জিত থাকছে।
কৃষি ও অর্থনীতির ধস:
চরের পলিমাটি কৃষিকাজের (যেমন: পাট, ধান, সবজি চাষ) জন্য অত্যন্ত উর্বর হলেও, অসময়ের বন্যা সব ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ফলে চরের বাসিন্দারা চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে।
১. পরিবেশগত উদ্বাস্তু বনাম "অবৈধ অনুপ্রবেশকারী" (The Double Jeopardy):
কাগজপত্র ও দলিলের বিলুপ্তি:
নদী ভাঙনের সবচেয়ে বড় শিকার হয় মানুষের আইনি পরিচয়। ঘরবাড়ি ও জমি যখন নদীগর্ভে চলে যায়, তখন বহু পরিবারের স্কুল সার্টিফিকেট, জমির খতিয়ান এবং দশকের পুরোনো ভোটার তালিকার কাগজের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'লিগেসি ডেটা' (Legacy Data) পানিতে ভেসে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়।
নাগরিকত্ব ও উচ্ছেদের ফাঁদ:
জমি হারিয়ে এই পরিবেশগত উদ্বাস্তুরা (Climate Refugees) যখন সমতল ভূমিতে, বনাঞ্চলের প্রান্তে বা সরকারি খাস জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজে, তখন রাষ্ট্র তাদের "অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী" বা দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে একদিকে পরিবেশ তাদের ভূমিহীন করে, অন্যদিকে সরকার তাদের ওপর উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে চিরতরে যাযাবর ও রাষ্ট্রহীন নাগরিকের দিকে ঠেলে দেয়।
১. মৌলিক অধিকার ও পরিকাঠামোর চরম অভাবযোগাযোগ ও চিকিৎসা সংকট:
চরাঞ্চলগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকা。 কোনো চরেই আধুনিক হাসপাতাল বা পাকা রাস্তা নেই। জরুরি প্রসবকালীন বা গুরুতর চিকিৎসার জন্য চরের গর্ভবতী নারী ও রোগীদের নৌকায় করে মূল ভূখণ্ডে আনার পথেই অনেকের মৃত্যু হয়。
শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রজন্ম:
স্কুলগুলোও চরের ভাঙন এবং বন্যার কারণে প্রায়ই বন্ধ হয়ে যায় বা নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। চরের শিশুদের বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ না করেই অল্প বয়সে গুয়াহাটি, দিল্লি বা ভারতের অন্যান্য বড় শহরে সস্তা শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি বা রিকশাচালক হিসেবে পরিযায়ী শ্রমে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়।
সহজ কথায়, আসামের চরাঞ্চলের মুসলিমদের স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির রুদ্ররূপ এবং রাজনৈতিক বৈরিতার সাথে লড়াই করে টিকে আছে।
অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অবস্থা:
আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অবস্থা রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের সূচকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অংশগুলোর একটি। তবে এই অনগ্রসরতা সব মুসলিমের ক্ষেত্রে সমান নয়; আদিবাসী অসমীয়া মুসলিমদের তুলনায় বাংলাভাষী মিয়া মুসলিমদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তাদের আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষাগত পরিস্থিতির মূল চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা ও জীবিকার সংকট:
ভূমিহীনতা ও চরাঞ্চলের অর্থনীতি:
বাংলাভাষী মুসলিমদের একটি বিশাল অংশ ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় অবস্থিত অস্থায়ী বালুচর বা 'চরাঞ্চলে' (Char Areas) বসবাস করে। প্রতি বছর বন্যার কারণে এই চরগুলো বিলীন হয়ে যায়, যার ফলে তারা স্থায়ীভাবে ভূমিহীন ও গৃহহীন হয়ে পড়ে।
শ্রমনির্ভর জীবিকা:
চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক, রাজমিস্ত্রি অথবা মাছ ধরার মতো কঠোর শারীরিক শ্রমের পেশায় নিয়োজিত।
আইনি লড়াইয়ের অর্থনৈতিক চাপ:
এনআরসি (NRC) এবং বিদেশী ট্রাইব্যুনালে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে মুসলিম পরিবারগুলো জমি, গবাদি পশু ও শেষ সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এই আইনি খরচ তাদের স্থায়ী দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
১. শিক্ষাগত অনুন্নয়ন ও সাক্ষরতার হারনিম্ন সাক্ষরতার হার:
আসামের মুসলিমপ্রধান জেলাগুলোতে (যেমন—ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, বরপেটা, দক্ষিণ শালমারা) সাক্ষরতার হার রাজ্যের গড় হারের চেয়ে অনেক কম। বিশেষ করে চরাঞ্চলের নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার আশঙ্কাজনকভাবে নিচে।
অবকাঠামোর অভাব:
চরাঞ্চলগুলোতে পর্যাপ্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। বর্ষাকালে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা হওয়ায় বছরের একটি বড় সময় শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না।
মাদ্রাসা বন্ধের সিদ্ধান্ত:
আসাম সরকার সমস্ত সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাগুলোকে সাধারণ স্কুলে রূপান্তর করেছে। এর ফলে ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত শিক্ষার মাধ্যমে যারা প্রাথমিক শিক্ষা নিচ্ছিল, সেই ধারায় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে।
১. খিলঞ্জিয়া মুসলিমদের তুলনামূলক ভালো অবস্থান:
চাকরি ও ব্যবসা:
আদিবাসী বা খিলঞ্জিয়া মুসলিমরা (গোরিয়া, মোরিয়া, দেশি ইত্যাদি) মূলত সমতল ভূমিতে বাস করে। সামাজিক স্বীকৃতির কারণে তারা সরকারি চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উচ্চশিক্ষায় মিয়া মুসলিমদের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
সরকারি উন্নয়ন কাউন্সিল:
আসাম সরকার আদিবাসী মুসলিমদের অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের জন্য বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিল ও আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা থেকে অভিবাসী মুসলিমরা বঞ্চিত।
১. মানব উন্নয়ন সূচকে প্রভাবস্বাস্থ্য ও পুষ্টিহীনতা:
অর্থনৈতিক অভাবের কারণে মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোতে শিশু মৃত্যুর হার এবং গর্ভবতী নারীদের পুষ্টিহীনতার হার অনেক বেশি। বাল্যবিয়ে এবং বহু সন্তান জন্মদানের প্রবণতাও এই অনগ্রসরতার অন্যতম কারণ।
বাল্যবিয়ে ও বহুবিবাহ বিরোধী সরকারি আইনের সামাজিক প্রভাব:
আসামে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকার কর্তৃক গৃহীত বাল্যবিয়ে এবং বহুবিবাহ বিরোধী কঠোর আইনি পদক্ষেপসমূহ রাজ্যের মুসলিম সমাজের, বিশেষ করে প্রান্তিক ‘মিয়া’ মুসলিমদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। একদিকে সরকার এটিকে নারী অধিকার ও সামাজিক সংস্কারের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করছে, অন্যদিকে সমালোচক ও মুসলিম সমাজ এটিকে রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। এই আইনগুলোর প্রধান সামাজিক প্রভাবসমূহ নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বাল্যবিয়ে বিরোধী অভিযান (Child Marriage Crackdown):
গণ-গ্রেপ্তার ও আতঙ্ক:
২০২৩ সালের শুরু থেকে সরকার বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন (PCMA) এবং পকসো (POCSO) আইনের অধীনে ব্যাপক ক্র্যাকডাউন শুরু করে। হাজার হাজার মুসলিম যুবক, তাদের পিতা-মাতা এবং বিয়ে পরিচালনাকারী কাজী বা ধর্মীয় গুরুদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর ফলে মুসলিমপ্রধান জেলাগুলোতে (যেমন—ধুবড়ি, বরপেটা) চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানো:
গ্রেপ্তারকৃত পুরুষদের বড় অংশই ছিল দরিদ্র দিনমজুর এবং তাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। স্বামীদের জেলে যাওয়ার ফলে তরুণী স্ত্রী এবং তাদের নবজাতক শিশুরা চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে。
স্বাস্থ্যসেবা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া:
আইনি আতঙ্কের কারণে অনেক গর্ভবতী কিশোরী এবং তাদের পরিবার প্রসবের জন্য সরকারি হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, যা মায়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ঘরে শিশু জন্মদানের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। তবে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে এই কঠোর অভিযানের ফলে রাজ্যে বাল্যবিয়ে এবং কিশোরী বয়সে মা হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
মানসিক আঘাত ও আত্মহত্যা:
বিয়ের বহু বছর পর অতীতের ঘটনার জন্য পুরোনো মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেক নারী মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে।
১. বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ আইন (Assam Prohibition of Polygamy Act):
আইনি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা:
আসাম বিধানসভায় 'দ্য আসাম প্রোহিবিশন অব পলিগ্যামি বিল' পাসের মাধ্যমে প্রথম স্ত্রীর আইনি ডিভোর্স ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে। এই আইন অমান্য করলে ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
মুসলিম পার্সোনাল ল'-এর ওপর আঘাত:
মুসলিম সমাজ মনে করে, এটি মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) আইনের পরিপন্থী, যা পুরুষদের বিশেষ শর্তে একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয়। মে ২০২৬ সালে বিধানসভায় পেশ হওয়া 'ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC), আসাম বিল'-এর মাধ্যমে বহুবিবাহের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হয়েছে।
আইনি বৈষম্যের অভিযোগ:
এই আইনটি রাজ্যের তফসিলি উপজাতি (ST) এবং ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত (Sixth Schedule) এলাকাগুলোর ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে, যেখানে প্রথাগত বহুবিবাহের চল রয়েছে। শুধুমাত্র মুসলিম সমাজকে লক্ষ্য করে এই আইন কার্যকর করার কারণে এটি সামাজিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করেছে。
১. সরকারের ইতিবাচক সংস্কারমূলক উদ্যোগ (Nijut Moina Scheme):
আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি মুসলিম মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার 'নিযুত মইনা' (Nijut Moina) প্রকল্প চালু করেছে। এই স্কিমের অধীনে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি স্তরের ছাত্রীদের মাসিক উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে, তবে শর্ত হলো ডিগ্রি শেষ করার আগে তারা বিয়ে করতে পারবে না। এর ফলে মুসলিম ছাত্রীদের ড্রপ-আউট বা স্কুল ছুটের হার কমেছে এবং উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে。সার্বিকভাবে, বাল্যবিয়ে ও বহুবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করার ক্ষেত্রে সরকারের এই পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে মুসলিম নারীদের শিক্ষাগত ও স্বাস্থ্যগত সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে আইনি সংস্কারের পেছনে সামাজিক সচেতনতা না বাড়িয়ে "কারাদণ্ড ও পুলিশি অভিযানের" মতো কঠোর পথ বেছে নেওয়ায় তা মুসলিম সমাজের দরিদ্র ও অনগ্রসর পরিবারগুলোর জীবনে গভীর ক্ষত ও মানসিক ট্রমার সৃষ্টি করেছে।
ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC):
ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হলো আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর পারিবারিক ও আইনি স্বাধীনতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলা অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় সংস্কার। মে ২০২৬ সালে আসাম বিধানসভায় 'দ্য ইউনিফর্ম সিভিল কোড, আসাম বিল, ২০২৬' পাস হয়, যার মাধ্যমে উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের পর আসাম ভারতের তৃতীয় রাজ্য হিসেবে ইউসিসি কার্যকর করে。এই নতুন আইনি ব্যবস্থা মুসলিমদের প্রথাগত পার্সোনাল ল' (শরিয়ত আইন)-এর জায়গা প্রতিস্থাপন করে সবার জন্য একক দেওয়ানি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছে। মুসলিম সমাজ ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায় ইউসিসি-র মূল প্রভাবগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. বহুবিবাহের আইনি অবসান ও কারাদণ্ড (Ban on Polygamy):
শরিয়ত আইনের রূপান্তর:
মুসলিম পার্সোনাল ল' অনুযায়ী পুরুষদের যে বিশেষ শর্তে একাধিক বিয়ের (বহুবিবাহ) অনুমতি ছিল, ইউসিসি চালুর পর তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
কঠোর শাস্তি:
আইনিভাবে প্রথম স্ত্রীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদ (ডিভোর্স) না করে দ্বিতীয় বিয়ে করলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে আইনটি কার্যকরের আগে হওয়া বহুবিবাহের ক্ষেত্রে কোনো ভূতাপেক্ষ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে না。
১. বিয়ে ও ডিভোর্সের বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন:
কাজী প্রথার গুরুত্ব হ্রাস:
প্রথাগতভাবে মুসলিমদের বিয়ে ধর্মীয় কাজীদের মাধ্যমে নিবন্ধিত হতো। তবে ইউসিসি অনুযায়ী, বিয়ের ৬০ দিনের মধ্যে সরকারি সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে ম্যারেজ মেমোরেন্ডাম জমা দিতে হচ্ছে।
বেআইনি ডিভোর্সের সমাপ্তি:
মৌখিক বা একতরফাভাবে শরিয়তি প্রথায় বিবাহবিচ্ছেদের আইনি বৈধতা এখন আর নেই। যেকোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে ডিভোর্সের জন্য এখন আদালতের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। অমান্য করলে আইনি জরিমানা ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
১. লিভ-ইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি:
বাধ্যতামূলক নিবন্ধন:
ইউসিসি-র সবচেয়ে আলোচিত একটি দিক হলো লিভ-ইন রিলেশনশিপ বা বিবাহবহির্ভূত সহবাসের রেজিস্ট্রেশন。 আসামে বসবাসকারী যেকোনো যুগল একসঙ্গে থাকতে চাইলে তা প্রশাসনকে জানাতে হচ্ছে।
মুসলিম সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি:
রক্ষণশীল মুসলিম পরিবার এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলো এই নিয়মটির তীব্র সমালোচনা করছে। তাদের মতে, মুসলিম সমাজে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ (হারাম)। রাষ্ট্র কর্তৃক আইন করে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী।
১. লিঙ্গ সমতা ও উত্তরাধিকার আইন (Gender Justice):
নারীদের সমানাধিকার:
নতুন আইনে পারিবারিক সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যার সমানাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রথাগত মুসলিম আইনে নারীরা যেভাবে সম্পত্তির হিস্যা পেতেন, ইউসিসি-র ফলে সেখানে বড় পরিবর্তন এসেছে, যা মুসলিম নারীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষাকে শক্তিশালী করছে।
সন্তানের বৈধতা:
লিভ-ইন বা লিগ্যাল ম্যারেজ ছাড়া জন্ম নেওয়া সন্তানদেরও এখন পিতার সম্পত্তিতে আইনি উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
১. সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক:
উপজাতিদের আওতামুক্ত রাখা:
আসামের ইউসিসি বিল থেকে সংবিধানে সুরক্ষাপ্রাপ্ত তফসিলি উপজাতি (Scheduled Tribes) এবং ষষ্ঠ তফশিলভুক্ত এলাকাগুলোকে সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে। মুসলিম নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, উপজাতিদের ঐতিহ্য রক্ষার খাতিরে ছাড় দেওয়া হলেও মুসলিমদের ধর্মীয় ও প্রথাগত রীতিনীতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করতেই এই আইনটি বেছে বেছে তৈরি করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
আসাম সরকারের মতে, ইউসিসি-র মূল লক্ষ্য হলো মুসলিম নারী ও শিশুদের অধিকার সুরক্ষা এবং সমাজ থেকে সামাজিক বৈষম্য দূর করা। তবে প্রান্তিক ও দরিদ্র মুসলিমদের বড় অংশের জন্য এই নতুন আইনি বাধ্যবাধকতা, আদালতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং স্বাধিকারের সংকোচন এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে।
মিয়া মুসলিমদের নিজস্ব প্রতিরোধ ও সাংস্কৃতিক জাগরণ—'মিয়া কবিতা' (Miya Poetry) আন্দোলন:
'মিয়া কবিতা' (Miya Poetry) আন্দোলন হলো আসামের প্রান্তিক বাংলাভাষী মুসলমানদের নিজস্ব সত্ত্বা রক্ষা, আইনি নিপীড়ন এবং তীব্র সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি অভিনব অহিংস সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক প্রতিরোধ। কয়েক দশক ধরে যে 'মিয়া' শব্দটিকে আসামে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বা অবমাননাকর গালি (Slur) হিসেবে ব্যবহার করা হতো, এই আন্দোলনের মাধ্যমে কবিরা সেই শব্দটিকে নিজেদের আত্মপরিচয় ও গর্বের প্রতীক হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন।এই অনন্য সাহিত্যিক আন্দোলনের মূল গতিপ্রকৃতি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আন্দোলনের উৎস ও বিকাশ:
ঐতিহাসিক সূত্রপাত:
১৯৩৯ সালে মওলানা বন্দে আলীর 'আ চড়ুয়ার প্রস্তাব' (A Charuwa's Proposition) এবং ১৯৮৩ সালের নেলি হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮৫ সালে খবির আহমদের লেখা 'আই বেগ টু স্টেট দ্যাট' (I Beg To State That) কবিতাকে এই ধারার আদি ভিত্তি ধরা হয়। খবির আহমদ তাঁর কবিতায় প্রথমবার নিজেকে "উদ্বাস্তু, ঘৃণিত মিয়া" হিসেবে সাহসের সাথে ঘোষণা করেছিলেন।
২০১৬ সালের নতুন জোয়ার:
বর্তমান ধারার মিয়া কবিতার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে ২০১৬ সালে কবি হাফিজ আহমদের "লিখে রাখো, আমি একজন মিয়া" (Write Down I Am a Miya) কবিতার মাধ্যমে। ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারউইশের বিখ্যাত 'আইডেন্টিটি কার্ড' কবিতার আদলে রচিত এই কবিতাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে এবং দ্রুত এটি একটি প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নেয়。
১. কবিতার মূল বিষয়বস্তু ও কান্নগাথামিয়া কবিতা মূলত চরাঞ্চলের মানুষের চোখের জল এবং রাষ্ট্রের দেওয়া অবিচারের দলিল।
এই কবিতাগুলোয় উঠে আসে:
নাগরিকত্ব ও ডি-ভোটারের যন্ত্রণা:
এনআরসি (NRC) তালিকায় নাম তোলার জন্য নথিপত্র জোগাড়ের আকুলতা এবং ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর অপমান。
পরিবেশগত ট্র্যাজেডি:
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে জমি হারানো এবং বন্যায় সবকিছু ভেসে যাওয়ার পরও রাষ্ট্র কর্তৃক 'অবৈধ দখলদার' আখ্যা পেয়ে উচ্ছেদ হওয়ার নির্মম বাস্তবচিত্র。
ভূমি ও মাতৃত্বের অধিকার:
কবি রেহানা সুলতানা যেমন তাঁর কবিতায় লিখেছেন—দশক ধরে এই মাটিকে মা বলে ডাকলেও, এই মাটি তাঁর সন্তানদের নিজের বলে স্বীকৃতি দেয়নি।
১. ভাষার প্রতিরোধ:
উপভাষার ব্যবহার:
উপভাষার গৌরব:
মিয়া কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষাগত বৈচিত্র্য। অতীতে স্কুল-কলেজে মিয়া মুসলিমরা নিজেদের মূলধারার সাথে খাপ খাওয়াতে প্রমিত অসমীয়া ভাষা ব্যবহার করলেও, এই আন্দোলনে কবিরা তাঁদের ঘরে ব্যবহৃত নিজস্ব উপভাষা (যেমন—ময়মনসিংহী, ঢাকাইয়া বা রংপুরী উপভাষা)-তে কবিতা লিখতে শুরু করেন।
সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে অস্বীকার:
প্রধান সারির চাপিয়ে দেওয়া ভাষার বিপরীতে নিজের মায়ের মুখের বুলিকে সাহিত্যের মর্যাদা দেওয়া ছিল এক প্রকার ভাষাগত বিপ্লব। তবে অনেক কবি অসমীয়া, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষাতেও তাঁদের ক্ষোভের কথা লিখেছেন।
১. বিতর্ক এবং রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থাএফআইআর (FIR) ও দেশদ্রোহের অভিযোগ:
২০১৯ সালে এনআরসি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে এই আন্দোলন যখন বিশ্ব মিডিয়ার নজর কাড়ে, তখন আসামের উগ্র-জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করে。 হাফিজ আহমদ, শালিম এম. হোসেনসহ অন্তত ১০ জন শীর্ষ মিয়া কবির বিরুদ্ধে গুয়াহাটির পুলিশ স্টেশনে মামলা (FIR) করা হয়। অভিযোগ তোলা হয় যে, এই কবিতাগুলো অসমীয়া সমাজকে বিশ্বদরবারে 'বিদেশী-বিদ্বেষী' (Xenophobic) হিসেবে চিত্রিত করছে এবং এনআরসি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে。
অসমীয়া বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা:
অনেক প্রগতিশীল অসমীয়া বুদ্ধিজীবীও এই আন্দোলনের সমালোচনা করে বলেন, অসমীয়া ভাষা বাদ দিয়ে কৃত্রিম উপভাষায় কবিতা লেখা আসামের সামগ্রিক সামাজিক মেলবন্ধনের জন্য ক্ষতিকর এবং এটি ধর্মীয় মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সব বাধা ও আইনি ভীতি উপেক্ষা করে, মিয়া কবিতা আজ কেবল আসামের চরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে 'প্রতিরোধের সাহিত্য' (Resistance Literature) হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। বন্দুক বা স্লোগানের বদলে কেবল শব্দের শক্তি দিয়ে নিজেদের আত্মপরিচয় ও বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের এই লড়াই সমসাময়িক ভারতের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
সার্বিক মূল্যায়ন বা উপসংহার:
আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবন, স্বাধীনতা এবং অস্তিত্বের লড়াই সমসাময়িক ভারতের সমাজ ও রাজনীতির অন্যতম এক বেদনাদায়ক ও জটিল বাস্তবচিত্র। দীর্ঘ আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, রাজ্যটির মুসলমানরা কোনো একক বা সমসত্ব সমাজ নয়; বরং তারা ভাষাগত, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক পটভূমির ভিত্তিতে স্পষ্টত বিভক্ত। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপট তাদের সবাইকে এক অভিন্ন সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।এই সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি চূড়ান্ত মূল্যায়ন নিচে কয়েকটি প্রধান স্তম্ভের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
পরিচয়ের সংকট ও কৃত্রিম বিভাজন:
ঐতিহাসিক খিলঞ্জিয়া (আদিবাসী) মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার আড়ালে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী মিয়া মুসলিমদের সুকৌশলে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আসামের অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষিখাতকে সমৃদ্ধ করলেও মিয়া মুসলিমদের ওপর থেকে "অবৈধ বিদেশী" বা "অনুপ্রবেশকারী"-র তকমা আজও মুছে যায়নি।
মানবাধিকার ও পরিবেশগত ট্র্যাজেডি:
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে জমি হারানো চরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ আসলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত শরণার্থী (Climate Refugees)। অথচ রাষ্ট্র তাদের পুনর্বাসন দেওয়ার পরিবর্তে 'ল্যান্ড জিহাদ' বা অবৈধ দখলদার আখ্যা দিয়ে ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে চরম অমানবিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাসস্থান ও জীবিকা হারিয়ে তারা এক চিরস্থায়ী যাযাবর জীবনে বন্দি হয়ে পড়েছে।
আইনি বেড়াজাল ও রাষ্ট্রহীনতার আতঙ্ক:
এনআরসি (NRC) এবং বিদেশী ট্রাইব্যুনালের মতো আধা-বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থাগুলোর কারণে এই জনগোষ্ঠীর জীবন থেকে স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তি চিরতরে হারিয়ে গেছে। সামান্য বানানের ভুল বা কাগজের অভাবে বৈধ নাগরিকরাও ডি-ভোটারের তালিকায় নাম লেখাচ্ছেন। এর ওপর সাম্প্রতিক ইউসিসি (UCC) এবং বাল্যবিয়ে বিরোধী কঠোর আইনি সংস্কারগুলো সামাজিক সুরক্ষার নামে প্রান্তিক মুসলমানদের আইনি ও পারিবারিক জীবনে এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও সুপ্ত সম্ভাবনা:
সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিপীড়নের বিপরীতে 'মিয়া কবিতা' (Miya Poetry) আন্দোলনের মতো অহিংস সাংস্কৃতিক জাগরণ প্রমাণ করে যে, এই জনগোষ্ঠী তাদের আত্মপরিচয় ও সম্মান রক্ষায় কতটা দৃঢ়। একই সাথে, শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন সচেতনতা এবং সরকারি 'নিযুত মইনা'র মতো শিক্ষামূলক স্কলারশিপের সুফল দীর্ঘমেয়াদে মুসলিম নারীদের ক্ষমতায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
চূড়ান্ত মন্তব্য:
আসামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ আজ এক বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, তবে তা যখন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা ভাষাগত সংখ্যালঘুকে লক্ষ্যবস্তু করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা সমগ্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিতকে দুর্বল করে। আসামের প্রকৃত উন্নয়ন এবং শান্তি তখনই সম্ভব, যখন চরাঞ্চলের এই প্রান্তিক মানুষদের কেবল "ভোট ব্যাংক" বা "সন্দেহভাজন নাগরিক" হিসেবে না দেখে, তাদের মৌলিক অধিকার, ভূমি এবং জীবনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে মূলধারার অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া হবে।
লেখক
মুহাম্মদ রাশেদ খান
সহযোগী সম্পাদক
মাসিক ইতিহাস অন্বেষা