
শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে থাকা দুই শিক্ষককের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত হলো। জিল হোসেনকে ফেলই দেখানো হলো।বাকৃবি।।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৬৭-৬৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন জিল হোসেন। ৭৩ সালে উনি অনার্সে একটি বিষয়ে ফেল করে শিক্ষকদের গাফিলতির কারণে। একজন শিক্ষক উনাকে ক্লাসরুমে বলে, জিল হোসেন তুমি তো ফেল করো নাই। একটা রাউন্ড ফিগার (০.৫ মার্ক) যোগ করতে ভুল করেছে শিক্ষকরা, তুমি ব্যাপারটা ডিপার্টমেন্টের অফিসে জানাও।
তখন ঐ শিক্ষকের কথা শুনে জিল হোসেন সাহেব ডিপার্টমেন্টের প্রধানকে জানান যে তার খাতায় একটা রাউন্ড ফিগার যোগ করা হয় নাই। তখন বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ ৪জন শিক্ষকের সমন্বয়ে একাডেমিক বোর্ড গঠন করে এই বিষয়ে একটা চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য।
এই চার শিক্ষকের মিটিং ২জন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে থাকে। তারা বলে, ভুল হউক আর যা-ই হোক, যেহেতু আমরা ফেল দিয়েছি এটা ফেইলই থাকুন। এখন পাশ দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অপমান। তখন সভার বাকি ২জন শিক্ষক প্রতিবাদ করে, তাই বলে আমাদের ভুলে একজন শিক্ষার্থীর জীবন নষ্ট করে দিব? আর আমরা কেমন শিক্ষক, নিজেদের ইগোর কারণে একজন শিক্ষার্থীর প্রতি অন্যায় আচরণ করে যাবো!
শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে থাকা দুই শিক্ষককের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত হলো। জিল হোসেনকে ফেলই দেখানো হলো।
পরবর্তীতে প্রতিবাদ করা ঐ ২ শিক্ষকের একজন মিটিং থেকে বের হয়ে ছাত্র, মানে জিল হোসেনের কাঁধে হাত রেখে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলছিলো, জিল হোসেন এই দেশটায় বাস করা যায় না, অমানুষে ভরে গেছে।
পরবর্তীতে ঐবছরই তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতা ছেড়ে বিদেশে চলে যায়, পরবর্তীতে আর কোনদিন দেশে ফেরেননি।
এই দিকে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের সিদ্ধান্ত হাসিমুখে মেনে নেন জিল হোসেন, কিন্তু তার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের ক্ষোভ রয়ে যায় তার প্রতি। এক বছর পর আবার পরিক্ষায় নকলের মিথ্যা অভিযোগ এনে এবার তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়।
এবার জিলহোসেন আইনের আশ্রয় নেন। বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তখন ১৯৭৬ সালে আদালত রায় দেয়, তার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দিয়ে তাকে আবার পড়াশোনার সুযোগ দিতে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আবার আপিল বিভাগে যায়, সেটা গড়িমসি করতে করতে শেষ পর্যন্ত চুড়ান্ত রায় হয়, তাকে ফেল দেখানো এবং ছাত্রত্ব বাতিল করা ছিলো অবৈধ। তাকে পাশ দিয়ে সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য রায় দেয় আদালত।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ আইন মানতে নারাজ, তারা বিভিন্নভাবে হ্যারেসমেন্ট করে উনাকে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মঈনুল হোসেন। তিনি জিল হোসেনকে আদালত প্রাঙ্গণে বলেন, আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় ভুল বুঝিয়ে এই মামলায় নিয়ে এসেছে, আমি কেন একজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে লড়ব।
শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনার্সের সার্টিফিকেট দিতে সম্মত হয়। কিন্তু তখন উনার বয়স ৪৭ বছর। এখন গ্রাজুয়েশনের সার্টিফিকেট দিয়ে কী করবেন তিনি!
তখন তিনি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন। কিন্তু সে সময় সবাই তাকে উপহাস, ঠাট্টা করতো। কেউ কেউ বলতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে সব হারাতে হবে, তার আগেই সরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। মামলা চালিয়ে যান।
শেষ পর্যন্ত ৯মার্চ ২০২৩ মামলার চুড়ান্ত রায় হয়েছে- উনার পরিবারকে দুই কোটি টাকা ক্ষতি পূরণ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশ দেওয়া।কারণ তার আগের বছর অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে তিনি মারা যান। বাংলাদেশের মতো অনুন্নত রাষ্ট্র হওয়ায় ক্ষতিপূরণ মাত্র ২ কোটি দেওয়ার রায় হয়েছে। উন্নত বিশ্বের যেকোনো দেশ হলে এই মামলায় বিশ-পঞ্চাশ কোটি এমনকি একশো কোটি টাকাও ক্ষতিপূরণের রায় হতে পারতো।
যাহোক এখন কথা হলো, দুই কোটি টাকা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় থেকে দিবে? -নিশ্চয়ই জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারের অনুদান থেকেই দিবে। কিন্তু কেন! এই টাকা ঐ দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বাকৃবি পুনরায় মামলা করে কতৃপক্ষ তাদের রিটায়ার্ড সুবিধা থেকেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া দরকার। শিক্ষক নামে অমানুষগুলোর শিক্ষা হওয়া দরকার। যাঁরা ইগোর কারণে একজন শিক্ষার্থীর জীবন নষ্ট করে দিলো। এরকম আরো শতশত শিক্ষক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে, যাঁরা প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের সাথে জুলুম করে চলছে!
ঐতিহাসিক এই রায় শোনার পর এই দিনে বেঁচে থাকলে ঐ শিক্ষক সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন, যিনি সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক বোর্ডের সিদ্ধান্তে হতাশ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, এই দেশে বাস করা যায় না জিল হোসেন এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষকতা ছেড়ে বিদেশে চলে গেছিলেন আর ফিরে আসেননি কোনদিন।